মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

বিশ্ব

নেপালে বন্যা দুর্যোগ আরও ভয়াবহ পর্যায়ে, বাড়ছে আঞ্চলিক ঝুঁকি

নেপালে হিমালয়জুড়ে বন্যা দুর্যোগ আরও জটিল হয়ে উঠেছে; বাড়ছে প্রাণহানি, নিখোঁজের সংখ্যা ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি।

Staff Correspondent ·

২৯ আগস্ট ২০২৬ — নেপালের ভয়াবহ হিমালয় অঞ্চলের বন্যা দুর্যোগ আরও বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বাড়ছে প্রাণহানি, এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ এবং ধ্বংসাবশেষে আটকে তৈরি হওয়া হ্রদ থেকে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে একটি বিশাল বরফ ও পাথরের ধস থেকে লহেন্দে খোলা ও ভোতে কোশি নদী ব্যবস্থায় আকস্মিক পানির স্রোত সৃষ্টি হলে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়। প্রবল আকস্মিক বন্যার স্রোত নেপালের রাসুয়া জেলার বিভিন্ন জনপদ এবং সীমান্তের ওপারে তিব্বত অঞ্চলে আঘাত হানে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ স্থাপনা ও সীমান্ত অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাড়ছে প্রাণহানি, গভীর হচ্ছে মানবিক সংকট

দুর্যোগে মোট প্রাণহানির সংখ্যা এখনো নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ দুর্গম বহু এলাকায় এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি এবং শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ২৯ আগস্ট পর্যন্ত নেপালি কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নেপালে ৫৭০ জনের বেশি মৃত্যুর খবর জানিয়েছে। একই সঙ্গে নেপাল ও তিব্বতজুড়ে প্রায় ২ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

হাজারো মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নদী, ধসে পড়া স্থাপনা এবং বিস্তীর্ণ ধ্বংসাবশেষ থেকে মরদেহ উদ্ধারে অনুসন্ধান অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সড়ক ও সীমান্ত পারাপারের অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বন্যার সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় থাকা মানুষদের ভাগ্য নির্ধারণেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।

দুর্যোগে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীসহ বিদেশি নাগরিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ জানিয়েছে, ৯০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, বাস্তুচ্যুতি এবং দুর্বল স্যানিটেশন পরিস্থিতি নতুন মানবিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

বেঁচে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করার পাশাপাশি আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করাই এখন তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।

জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমালয়ের নতুন ঝুঁকি

এই বিপর্যয় হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞানী ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ সরে যাচ্ছে এবং বরফ ও পাথরের কাঠামো দুর্বল হচ্ছে। এর ফলে আকস্মিক হিমবাহ-সম্পর্কিত দুর্যোগের সম্ভাবনা বাড়ছে। এবারের বন্যার সূচনা একটি বরফ-পাথরের ধস এবং নদীর সাময়িক বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হচ্ছে। এর ফলে খুব দ্রুত বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে আসে।

ঝুঁকি শুধু সাধারণ মৌসুমি বন্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হিমালয়ের হিমবাহ সরে যাওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ি পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘস্থায়ী বরফযুক্ত মাটি অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।

আগস্টের এই দুর্যোগ দেখিয়েছে, সংকীর্ণ হিমালয় উপত্যকায় বসবাসকারী জনপদগুলো কত দ্রুত এমন দুর্যোগে বিপর্যস্ত হতে পারে।

নতুন বন্যার আশঙ্কা ও আঞ্চলিক প্রভাব

নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ধ্বংসাবশেষে একটি নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হওয়ায় কর্তৃপক্ষ এখন আরেকটি ঝুঁকি মোকাবিলা করছে। হ্রদটির প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নিচের দিকে আবারও ভয়াবহ পানির স্রোত নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

ঝুঁকির কারণে কিছু সময় উদ্ধার অভিযান স্থগিতও করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষ ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা হ্রদের পানির উচ্চতা এবং প্রাকৃতিক বাধাটির স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করছেন। একই ধরনের বিপর্যয় আবার ঘটবে—এমন আশঙ্কা নিশ্চিত নয়, তবে পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত।

এই দুর্যোগের প্রভাব নেপালের সীমানার বাইরেও বিস্তৃত। হিমালয় থেকে উৎপন্ন বহু নদী আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবাহিত হওয়ায় বড় ধরনের বন্যা ও ভূমিধস ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের জনপদেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নেপাল-তিব্বত দুর্যোগের পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষও নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করেছে।

সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ স্থাপনা ও সীমান্ত অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নেপাল ও চীনের মধ্যে পরিবহন, বাণিজ্য ও পর্যটনেও বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে অবকাঠামো পুনর্গঠন তাই বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উদ্ধার অভিযান ও সামনে নেপালের চ্যালেঞ্জ

অত্যন্ত দুর্গম পরিস্থিতির মধ্যেও নেপালের নিরাপত্তা বাহিনী, জরুরি সেবাকর্মী ও স্থানীয় জনগণ উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। বেঁচে থাকা মানুষদের সরিয়ে নিতে এবং জরুরি সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে পৌঁছানোর কাজকে ধীর করে দিচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেছে এবং বাস্তুচ্যুতি, অতিরিক্ত জনসমাগম ও দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে বাড়তি ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে।

নেপালের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো মানুষের জীবন রক্ষা এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর সহায়তা নিশ্চিত করা। তবে এই দুর্যোগ আরও দীর্ঘমেয়াদি একটি চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে—জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পাহাড়ি ঝুঁকি যখন দ্রুত ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করা।

পরিবর্তনশীল হিমবাহ ও অস্থিতিশীল পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্য প্রচলিত বন্যা প্রস্তুতি হয়তো আর যথেষ্ট নয়। হিমালয় অঞ্চলের সরকারগুলোর প্রয়োজন হবে আরও শক্তিশালী হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, সীমান্তপারের তথ্য বিনিময়, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে সংঘটিত হতে পারে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা।

উদ্ধারকারীরা যখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন নেপালের সামনে রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের বিশাল দায়িত্ব। একই সঙ্গে উষ্ণায়নপ্রভাবিত পরিবর্তনশীল হিমালয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াও দেশটির দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

ধরিত্রী

ইউরোপের তাপপ্রবাহে শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, বাড়ছে দাবানল ও অর্থনৈতিক চাপ

বারবার তাপপ্রবাহ ও খরায় ইউরোপের নদীগুলো রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমেছে, বাড়ছে দাবানল এবং কৃষি, জ্বালানি ও পরিবহনে চাপ।

৩ মিনিটের পড়া

ধরিত্রী

সুমেরুতে দ্রুত গলছে হিমবাহ, বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আশঙ্কা

সুমেরু অঞ্চলে দ্রুত উষ্ণায়ন ও বরফ গলার কারণে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যা উপকূলীয় শহর ও জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

২ মিনিটের পড়া

ধরিত্রী

ঐতিহ্যবাহী সীমান্ত পেরিয়ে উত্তর ইউরোপে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ দাবানল

২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাবানল প্রমাণ করছে যে জলবায়ু সংকট এখন আর কেবল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই।

৩ মিনিটের পড়া