জুন ২০২৬ বিশ্বে রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন
জুনে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১৬.৫৪°C-এ পৌঁছায়; সমুদ্রের তাপমাত্রাও জুনের রেকর্ডে সর্বোচ্চ ছিল।

বৈশ্বিক উষ্ণতা পৌঁছেছে ব্যতিক্রমী মাত্রায়
কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন ছিল বিশ্বে রেকর্ড হওয়া দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন। ওই মাসে বৈশ্বিক গড় ভূপৃষ্ঠের বায়ুর তাপমাত্রা ছিল ১৬.৫৪°C, যা ১৯৯১–২০২০ সময়কালের জুনের গড়ের চেয়ে ০.৫৬°C বেশি এবং শিল্পপূর্ব ১৮৫০–১৯০০ সময়কালের আনুমানিক গড়ের চেয়ে ১.৩৯°C বেশি।
রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ জুন, ২০২৪ সালের তুলনায় জুন ২০২৬ মাত্র ০.১২°C কম উষ্ণ ছিল। একই সঙ্গে ২০২৩ সালের জুনের চেয়ে এটি ০.০৩°C বেশি উষ্ণ ছিল; ২০২৩ এতদিন তৃতীয় উষ্ণতম জুন হিসেবে ছিল।
সাম্প্রতিক তথ্য অস্বাভাবিক বৈশ্বিক উষ্ণতার ধারাবাহিকতাকেও তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও জুন ২০২৬-কে তাদের রেকর্ডে দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের হিসাবে, মাসটির বৈশ্বিক ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২০শ শতকের গড়ের চেয়ে ১.০৯°C বেশি ছিল।
NOAA আরও জানিয়েছে, ১৮৫০–২০২৬ সময়ের রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ দশটি জুনই ২০১৫ সালের পর ঘটেছে। জুন ২০২৬ ছিল টানা ৫০তম জুন, যখন বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২০শ শতকের গড়ের ওপরে ছিল।
সমুদ্রেও বাড়ছে তাপ
উষ্ণতা শুধু স্থলভাগে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও জুনে ব্যতিক্রমী উচ্চতায় পৌঁছায়।
৬০° দক্ষিণ থেকে ৬০° উত্তর অক্ষাংশের মধ্যবর্তী অতিরিক্ত-মেরু সমুদ্রাঞ্চলে জুন ২০২৬-এর গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছিল ২০.৮৬°C। কোপার্নিকাসের রেকর্ড অনুযায়ী, জুন মাসের জন্য এটিই ছিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। ২০২৪ সালের আগের রেকর্ডের চেয়ে এটি মাত্র ০.০১°C বেশি।
ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়েও অস্বাভাবিক উষ্ণ পরিস্থিতি ছিল। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর বিকাশমান পরিস্থিতি দেখা দেয় এবং পরবর্তী মাসগুলোতে তা দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়।
উচ্চ সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহও যুক্ত ছিল। পশ্চিম ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। অস্বাভাবিক উষ্ণ সমুদ্র ও স্থলভাগের উচ্চ তাপমাত্রা মিলেই জুনের ব্যতিক্রমী আবহাওয়ার পরিস্থিতি আরও তীব্র করে।
পশ্চিম ইউরোপে রেকর্ড তাপ
পশ্চিম ইউরোপে ২০২৬ সালের জুন ছিল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ জুন। অঞ্চলটির গড় ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২০.৭৪°C-এ পৌঁছায়, যা ১৯৯১–২০২০ সময়কালের জুনের গড়ের চেয়ে প্রায় ৩.০৫°C বেশি।
মাসের দ্বিতীয়ার্ধে তাপপ্রবাহ তীব্র হয়ে পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি ও বেনেলাক্সভুক্ত দেশগুলোর বিভিন্ন এলাকায় মাসিক তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে ৩–৫°C বেশি ছিল।
বিভিন্ন দেশে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। জার্মানির কোশেনে ২৮ জুন তাপমাত্রা ৪১.৭°C-এ পৌঁছায়। ফ্রান্সের পুল্লোয়ায় তাপমাত্রা ৪৩.৮°C-এ ওঠে। স্পেনের কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৪০°C ছাড়িয়ে যায় এবং বিলবাওয়ে ৪২.৭°C রেকর্ড করা হয়।
তীব্র তাপের সঙ্গে ব্যাপক শুষ্কতাও দেখা দেয়। কোপার্নিকাস ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চরম তাপ ও শুষ্ক পরিস্থিতি আইবেরীয় উপদ্বীপ এবং দক্ষিণ ফ্রান্সে দাবানলের কার্যক্রম বাড়াতে ভূমিকা রাখে। পূর্ব ইউরোপের কিছু এলাকায় খরার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
অব্যাহত বৈশ্বিক সতর্কসংকেত
জুনের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, চরম তাপ আর কোনো একক অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন স্থল ও সমুদ্রাঞ্চলে অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা গেছে, আর ইউরোপ একটি বিশেষভাবে তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে।
ইউরোপের বাইরে মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম সাইবেরিয়া, উত্তর কানাডা এবং অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের পশ্চিমাঞ্চলেও গড়ের তুলনায় অনেক বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করে কোপার্নিকাস। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ পরিস্থিতি ছিল।
অন্যদিকে পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব দক্ষিণ আমেরিকা এবং পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বড় অংশে গড়ের চেয়ে কম তাপমাত্রা দেখা যায়। অর্থাৎ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অর্থ এই নয় যে প্রতিটি স্থান ও প্রতিটি সময়ে তাপমাত্রা একইভাবে বাড়বে।
জুন ২০২৬-এর গুরুত্ব হলো বৈশ্বিক উষ্ণতার স্থায়িত্ব, রেকর্ড সমুদ্রতাপমাত্রা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র চরম আবহাওয়ার সমন্বয়। এই পরিসংখ্যান একটি উষ্ণায়নশীল পৃথিবীর আরেকটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে এবং চরম তাপ সমাজ, প্রতিবেশব্যবস্থা ও অবকাঠামোর ওপর যে বাড়তি চাপ তৈরি করছে, তার মাত্রাও নির্দেশ করে।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
সুমেরুতে দ্রুত গলছে হিমবাহ, বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আশঙ্কা
সুমেরু অঞ্চলে দ্রুত উষ্ণায়ন ও বরফ গলার কারণে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যা উপকূলীয় শহর ও জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
উত্তপ্ত দক্ষিণ এশিয়া: চরম তাপমাত্রাই হয়ে উঠছে নতুন স্বাভাবিকতা
দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র গরম আরও ঘন ঘন ও আগেভাগে আসছে, বাড়ছে স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অবকাঠামোর ঝুঁকি।
নেপালে বন্যা দুর্যোগ আরও ভয়াবহ পর্যায়ে, বাড়ছে আঞ্চলিক ঝুঁকি
নেপালে হিমালয়জুড়ে বন্যা দুর্যোগ আরও জটিল হয়ে উঠেছে; বাড়ছে প্রাণহানি, নিখোঁজের সংখ্যা ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি।
ইউরোপের তাপপ্রবাহে শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, বাড়ছে দাবানল ও অর্থনৈতিক চাপ
বারবার তাপপ্রবাহ ও খরায় ইউরোপের নদীগুলো রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমেছে, বাড়ছে দাবানল এবং কৃষি, জ্বালানি ও পরিবহনে চাপ।




