ইউরোপের তাপপ্রবাহে শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, বাড়ছে দাবানল ও অর্থনৈতিক চাপ
বারবার তাপপ্রবাহ ও খরায় ইউরোপের নদীগুলো রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমেছে, বাড়ছে দাবানল এবং কৃষি, জ্বালানি ও পরিবহনে চাপ।

ইউরোপ এ বছর একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হচ্ছে। চরম তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও ব্যাপক দাবানল একসঙ্গে পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। সংকটটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গরম দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ইউরোপের প্রধান নদী, বন, কৃষি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও পরিবহনপথও এর প্রভাবের মুখে পড়েছে।
নাসার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মে মাস থেকেই পশ্চিম ইউরোপে একের পর এক তাপপ্রবাহ শুরু হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা বারবার ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়েছে। জুনে ফ্রান্সের বোর্দো টানা তিন দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙে এবং ২৪ জুন তাপমাত্রা ৪২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে। ২৬ মে লন্ডনে তাপমাত্রা ৩৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে, যা আগের মে মাসের রেকর্ডের চেয়ে ২.৩ ডিগ্রি বেশি। আগস্টে স্লোভাকিয়াতেও দিনের ও রাতের তাপমাত্রায় জাতীয় রেকর্ড হয়েছে।
ইউরোপজুড়ে বাড়ছে তাপ ও খরা
চরম তাপমাত্রার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির ঘাটতিও যুক্ত হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টার জানিয়েছে, পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বড় অংশে খরা পরিস্থিতি সংকটজনক রয়েছে। বলকান অঞ্চল ও ইতালিতেও পরিস্থিতি গুরুতর।
আগস্টের শুরুতে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, বলকান এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বড় অংশে তাপপ্রবাহ আঘাত হানে। ইউরোপীয় ড্রট অবজারভেটরি জানিয়েছে, গ্রীষ্মজুড়ে খরা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং পূর্বাভাস অনুযায়ী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে।
তাপ ও বৃষ্টির ঘাটতির সম্মিলিত প্রভাব ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে লোয়ার, পো, রাইন ও দানিউব রেকর্ড নিম্ন পানিস্তরে পৌঁছেছে।
জার্মানির পরিবহন ও শিল্প খাতের জন্য রাইন বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। নদীর অন্যতম অগভীর অংশ কাউবে পানির স্তর অত্যন্ত নিচে নেমে যাওয়ায় নৌপরিবহন ব্যাহত হয়েছে এবং জাহাজগুলোকে কম পণ্য বহন করতে হচ্ছে।
ইউরোপের তাপপ্রবাহ এখন শুধু আবহাওয়ার সংকট নয়, এটি অর্থনীতিরও সংকটে পরিণত হচ্ছে।
দানিউবও তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাঙ্গেরিতে নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় পাক্স পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাপ তৈরি হয়েছে, কারণ কেন্দ্রটি শীতলীকরণের জন্য নদীর পানি ব্যবহার করে। তীব্র গরমের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয় এবং কর্তৃপক্ষ সাশ্রয়মূলক ব্যবস্থা নেয়।
দাবানল ও কৃষিতে ক্ষতি
শুষ্ক পরিস্থিতি পুরো ইউরোপে বিপজ্জনক দাবানলের পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, জুলাইয়ে পশ্চিম ইউরোপে পোড়া এলাকার পরিমাণ এবং আগুন থেকে নির্গত দূষণের দিক থেকে অস্বাভাবিক মাত্রার দাবানল দেখা গেছে।
ফ্রান্সে পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুতর হয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ফ্রান্সের দাবানল থেকে নির্গত দূষণের মাত্রা ২০২২ ও ২০২৩ সালের ভয়াবহ আগুনের বছরগুলোর সমান বা তার চেয়েও বেশি হয়েছে। ফলে গত ২৪ বছরের মধ্যে ২০২৬ দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের বছরগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। স্পেনেও আগুন থেকে নির্গত দূষণ মৌসুমি গড়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে।
তাপ ও খরার কারণে কৃষিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কৃষকেরা ফসল ও পশুপালনে বড় ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। ফ্রান্সে ভুট্টাসহ শস্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং সবজি উৎপাদনেও বড় ক্ষতি হয়েছে। ইতালিতে বিশেষ করে পো উপত্যকায় ব্যাপক কৃষিজমি খরার চাপে রয়েছে।
প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতেও। নদীর পানির স্তর কমে গেলে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হতে পারে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর শীতলীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পানির সরবরাহ কমে যেতে পারে। ফ্রান্সে উচ্চ তাপমাত্রা ও অস্বাভাবিক সামুদ্রিক পরিস্থিতিও পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে।
ইউরোপের সমুদ্রও অস্বাভাবিক উষ্ণ
তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের সমুদ্রগুলোর পানিও অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠেছে, যা গ্রীষ্মের পরিবেশগত চাপকে আরও বাড়িয়েছে।
জুলাইয়ে ভূমধ্যসাগরের গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছে। আগস্টের শুরুতে ম্যালোর্কার কাছে একটি বয়া প্রায় ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই এই অস্বাভাবিক সমুদ্র উষ্ণতার প্রধান কারণ।
গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিস্কে উপসাগরের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকায় সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের প্রভাব ছিল। অস্বাভাবিক উষ্ণ পানি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে, খাদ্যশৃঙ্খলা ব্যাহত করতে পারে এবং স্থলভাগে রাতের তাপমাত্রা বাড়াতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, চরম তাপ, খরা ও দাবানলের সম্মিলিত উপস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে বিভিন্ন জলবায়ু ঝুঁকি একে অপরকে আরও তীব্র করে সমাজ ও অর্থনীতিতে ধারাবাহিক প্রভাব তৈরি করতে পারে।
ইউরোপের এই গ্রীষ্ম এখন মহাদেশটির সহনশীলতার একটি বড় পরীক্ষা। শুকিয়ে যাওয়া নদী ও সীমিত নৌপরিবহন থেকে শুরু করে জ্বলতে থাকা বন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ও চাপের মুখে থাকা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা—প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে একাধিক খাতে। ইউরোপীয় পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুষ্ক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছে। ফলে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ শুধু আলাদা আলাদা গরমের দিন পার করা নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী ও ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা জলবায়ু সংকটের বিস্তৃত প্রভাব সামলানো।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
শক্তিশালী সুপার এল নিনো নিয়ে বিজ্ঞানীদের সতর্কতা, বাড়তে পারে জলবায়ুর প্রভাব
শক্তিশালী এল নিনো ও ইতিবাচক ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল দক্ষিণ এশিয়ায় তাপ, বৃষ্টিপাত ও কৃষিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।
নেপালে বন্যা দুর্যোগ আরও ভয়াবহ পর্যায়ে, বাড়ছে আঞ্চলিক ঝুঁকি
নেপালে হিমালয়জুড়ে বন্যা দুর্যোগ আরও জটিল হয়ে উঠেছে; বাড়ছে প্রাণহানি, নিখোঁজের সংখ্যা ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি।
জুন ২০২৬ বিশ্বে রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন
জুনে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১৬.৫৪°C-এ পৌঁছায়; সমুদ্রের তাপমাত্রাও জুনের রেকর্ডে সর্বোচ্চ ছিল।
ডিপফেক ও এআই স্বচ্ছতায় কঠোর নিয়ম কার্যকর করছে ইউরোপ
২ আগস্ট থেকে ইইউ এআই আইন প্রয়োগের নতুন পর্যায়ে গেছে, যেখানে ডিপফেক, এআই কনটেন্ট ও শক্তিশালী এআই মডেল নজরদারিতে রয়েছে।




