উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক পরিসর খুঁজছে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া
পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সংলাপ চায় ওয়াশিংটন; বেইজিং সিউলকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছে।

কোরিয়া উপদ্বীপে উত্তেজনা অব্যাহত থাকার মধ্যেই চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া নতুন কূটনৈতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আবারও সংলাপ শুরু করার আগ্রহ দেখাচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ২০ আগস্ট সিউলে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউনের সঙ্গেও আলোচনা করেন। পাঁচ বছরের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় এটি ছিল ওয়াংয়ের প্রথম সরকারি সফর। এই সফর এমন সময়ে হলো, যখন সিউল বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার নিরাপত্তা জোটও বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
এই কূটনৈতিক তৎপরতার আগে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার পরিসর ও সময় কমিয়েছে। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আবার বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের আহ্বান বেইজিংয়ের
ওয়াংয়ের সফর সিউলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ কোরিয়ার আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া ঠেকানোর চীনা প্রচেষ্টারও প্রতিফলন।
চীন দক্ষিণ কোরিয়াকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা, জোটভিত্তিক সংঘাত এড়ানো এবং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো পক্ষ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বেইজিং উত্তর কোরিয়ার প্রতি ওয়াশিংটনের নীতি পরিবর্তন এবং নতুন করে সংলাপের পথ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
সিউলের জন্য এটি একটি কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন। দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিভিত্তিক মিত্র। অন্যদিকে চীন দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার এবং কোরিয়া উপদ্বীপের উত্তেজনা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক জোটে বিস্তৃত হওয়ায় এই ভারসাম্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা অংশীদারত্ব দুর্বল না করাই সিউলের প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
ফলে কোরিয়া উপদ্বীপ এখন পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর কৌশলগত ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিযোগিতারও অংশ হয়ে উঠেছে।
নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত ওয়াশিংটনের
পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় শুরু করার আগ্রহ দেখিয়ে ওয়াশিংটনও উপদ্বীপের কূটনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বার্ষিক উলচি ফ্রিডম শিল্ড সামরিক মহড়া নির্ধারিত ১১ দিন থেকে কমিয়ে পাঁচ দিনে এনেছে এবং কিছু মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ কমিয়েছে। কিম জং উনের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগের বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহের পর এই সিদ্ধান্ত আসে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি সামরিক মহড়া কমানোর ঘটনাকে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সংলাপ পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন।
তবে উত্তর কোরিয়া এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং মহড়া কমানোর বিষয়ে লির বক্তব্যকে "double-dealing" বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে সাম্প্রতিক কোনো যোগাযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এখনো বৈরী।
২০ আগস্ট উত্তর কোরিয়া সমুদ্রের দিকে প্রায় ১০টি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করলে কূটনৈতিক সংকেত ও সামরিক আচরণের ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়।
এই উৎক্ষেপণ দেখিয়ে দেয়, কয়েক বছর ধরে উপদ্বীপের সম্পর্ককে প্রভাবিত করা নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে কূটনৈতিক যোগাযোগকে আলাদা করা কতটা কঠিন।
কঠিন ভারসাম্যের কেন্দ্রে সিউল
নতুন কূটনৈতিক সমীকরণে দক্ষিণ কোরিয়া এখন কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট লিকে একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে হচ্ছে এবং পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর সম্ভাবনাও খুঁজতে হচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার পরিবর্তিত সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের সামরিক মহড়া পরিবর্তন করছে। এর মধ্যে ড্রোন, জিপিএস ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং সাইবার কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
ওয়াশিংটনের কাছে মহড়ার পরিসর কমানো অতিরিক্ত কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করতে পারে। কিন্তু পিয়ংইয়ংয়ের কাছে সামরিক সক্ষমতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার।
চীনও বৃহত্তর কূটনৈতিক ভূমিকা চাইছে। ওয়াংয়ের সফরে বেইজিং ও সিউল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে।
নভেম্বরে শেনঝেনে অনুষ্ঠিতব্য এপেক সম্মেলনের সময় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে একটি শীর্ষ বৈঠকের বিষয়ও চীন বিবেচনা করছে। এটি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের আরেকটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অগ্রগতি নয়, কূটনৈতিক সুযোগের সন্ধান
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এখনো কোরিয়া উপদ্বীপে কোনো বড় কূটনৈতিক সাফল্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং এগুলো এমন একটি জটিল পরিবেশ তুলে ধরছে, যেখানে ওয়াশিংটন, বেইজিং, সিউল ও পিয়ংইয়ং ভিন্ন কিন্তু পরস্পরসম্পর্কিত লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
ওয়াশিংটন পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় শুরু করতে চায়। সিউল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট বজায় রেখে উত্তেজনা কমাতে চায়। বেইজিং চায় দক্ষিণ কোরিয়া কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখুক এবং জোটভিত্তিক সংঘাত আরও গভীর না হোক। উত্তর কোরিয়া কূটনৈতিক সংকেতের পাশাপাশি সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছে।
এ কারণে দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভাব্য কূটনৈতিক সেতু হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী কৌশলগত স্বার্থের কারণে সিউলের ওপর চাপও বাড়ছে।
আগামী মাসগুলোতে এসব সমান্তরাল উদ্যোগ বাস্তব আলোচনায় রূপ নেয় কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া সংলাপের সম্ভাবনা, চীন-দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা এবং এপেক সম্মেলনে শি-লির সম্ভাব্য বৈঠক নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও অব্যাহত সমালোচনা দেখিয়ে দিচ্ছে, মৌলিক নিরাপত্তা সংকট এখনো অমীমাংসিত।
পূর্ব এশিয়ার জন্য তাই মূল প্রশ্ন শুধু সংলাপ আবার শুরু হবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো, দুই কোরিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রধান শক্তিগুলো তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নিরাপত্তা স্বার্থের পাশাপাশি কূটনীতি অব্যাহত রাখার মতো পর্যাপ্ত রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করতে পারবে কি না।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মহড়া কমানোর পর ১০ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল উত্তর কোরিয়া
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর একদিন পর প্রায় ১০টি স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে উত্তর কোরিয়া।
এআই ঘিরে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, বাড়ছে জাতীয় কৌশল
চিপ, কম্পিউটিং শক্তি, দক্ষ জনবল, ডেটা ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করে এআই প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
সিরিয়া সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা তালিকার বাইরে: একটি রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম, নাকি ভূরাজনীতির নতুন খেলা?
৪৭ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যা দেশটির জন্য নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
এআই দ্রুত এগোচ্ছে—কিন্তু সামনে যা আসছে, তার জন্য কি মানুষ প্রস্তুত?
চীনে রোবট দুর্ঘটনা বড় প্রশ্ন তুলেছে: এআই-চালিত যন্ত্র দ্রুত এগোলে, মানুষ কি তার বিকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে?




