মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

মতামত

সিরিয়া সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা তালিকার বাইরে: একটি রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম, নাকি ভূরাজনীতির নতুন খেলা?

৪৭ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যা দেশটির জন্য নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।

Abdul Momen Talukder ·

৪৭ বছরের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি

গত ২৪ আগস্ট (২০২৬), যুক্তরাষ্ট্র সরকারিভাবে সিরিয়াকে তাদের ‘স্টেট স্পনসরস অব টেররিজম’ বা সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। ১৯৭৯ সালে হাফেজ আল-আসাদের শাসনামলে যে তালিকাভুক্তি শুরু হয়েছিল, প্রায় ৪৭ বছর পর তার অবসান ঘটল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জুলাইয়ে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পর সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী ৪৫ দিনের পর্যালোচনা মেয়াদ শেষে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। একই সঙ্গে বাতিল হয়েছে সাবেক আল-নুসরা ফ্রন্ট তথা হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) ‘বৈশ্বিক সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্তিও যে সংগঠনের সাবেক নেতা আহমেদ আল-শারা বর্তমানে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট। এখন আন্তর্জাতিক এই তালিকায় অবশিষ্ট থাকল কেবল কিউবা, ইরান ও উত্তর কোরিয়া।

সংখ্যা ও তারিখের আড়ালে এই ঘটনাটি আসলে একটি রাষ্ট্র ও সমাজের পুনর্গঠনের গল্প, আবার একই সঙ্গে একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দাবাখেলারও অংশ। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এখানে রাষ্ট্রের বৈধতা (legitimacy), আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং ক্ষমতার রূপান্তর এই কয়েকটি ধারণা একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।

১৯৭৯ সালে হাফেজ আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গি গোষ্ঠীকে মদদ দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তাঁর ছেলে বাশার আল-আসাদের শাসনামলেও এই নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল, বরং ২০০৩ সালে সিরিয়া অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড লেবানিজ সভরেন্টি রেস্টোরেশন অ্যাক্ট এবং ২০০৪ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তা আরও কঠোর হয়। ২০১১ সালে সিরিয়ায় গণবিক্ষোভ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র আরও ব্যাপক অবরোধ আরোপ করে, যা কয়েক দশক ধরে সিরিয়ার অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহী জোটের হাতে বাশার আল-আসাদের পতন ঘটে। এই জোটের নেতৃত্বে ছিলেন আহমেদ আল-শারা, যিনি নিজে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। আসাদ-উত্তর সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। চলতি বছরের জুনে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সিরিয়ার ওপর বেশিরভাগ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন, এবং জুলাইয়ে কংগ্রেসকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠান।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, আল-শারা সরকার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ থেকে সিরিয়াকে সম্পূর্ণভাবে দূরে রাখার ব্যাপারে ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ ও অঙ্গীকার’ দেখানোর স্বীকৃতিস্বরূপ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নতুন সুযোগ

সিরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সাফওয়াত রাসলান এই সিদ্ধান্তকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সিরিয়ার ‘স্বাভাবিক অবস্থানে’ প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন। এই তালিকাভুক্তি বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক অর্থসাহায্যের ক্ষেত্রে একধরনের অদৃশ্য দেয়াল হিসেবে কাজ করত। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শিবানি একে দেশের বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় পুনঃসংযুক্তি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথে শেষ বড় বাধা অপসারণ বলে অভিহিত করেছেন।

সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বললে, একটি রাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা’ তকমা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়—এটি এক ধরনের প্রতীকী সহিংসতা (symbolic exclusion), যা রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সমাজের ‘স্বাভাবিক সদস্য’ পরিচয় থেকে বঞ্চিত রাখে। এই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা মানে আল-শারা সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বৈধতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী স্বীকৃতি, যা অভ্যন্তরীণভাবেও সরকারের অবস্থান মজবুত করতে সাহায্য করবে।

চৌদ্দ বছরের গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়ার অবকাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে বিদেশি প্রযুক্তি, পুঁজি ও দক্ষতা প্রয়োজন। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য সিরিয়ায় প্রবেশের পথ সহজ হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এই সিদ্ধান্ত নিছক মানবিক সহানুভূতি নয়, বরং একধরনের কৌশলগত বিনিয়োগ বলা চলে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে ইরান ও রাশিয়ার প্রভাববলয় থেকে দূরে টেনে আনতে চাইছে এবং দেশটির দীর্ঘদিনের ‘পরিত্যক্ত রাষ্ট্র’ (pariah state) পরিচয়ের অবসান ঘটাতে সহায়তা করতে চাইছে। একই সঙ্গে আইএস-বিরোধী লড়াইয়ে আল-শারা সরকারের সহযোগিতার প্রতি স্বীকৃতিও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে যে রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা কীভাবে নির্ধারিত হয়? যে ব্যক্তি গতকাল পর্যন্ত ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন, ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সমীকরণ বদলে গেলে তিনি আজ ‘অংশীদার রাষ্ট্রপ্রধান’ হয়ে ওঠেন। এটি দেখায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘সন্ত্রাসবাদ’ তকমাটি অনেক সময় নৈতিক বিচারের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক সুবিধার প্রশ্ন।

সুযোগের পাশাপাশি রয়ে গেছে ঝুঁকিও

এই অর্জনের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে যা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখনও ভঙ্গুর। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিভাজন, এবং নতুন সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বাইরের বৈধতা ভেতরের সামাজিক সংহতির (social cohesion) বিকল্প নয়।

নির্ভরতার নতুন রূপ। পশ্চিমা বিনিয়োগ ও সমর্থনের ওপর নির্ভরতা বাড়লে তা সিরিয়ার নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে একধরনের নতুন নির্ভরশীলতা (dependency) তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়, যা উন্নয়ন সমাজবিজ্ঞানে বহুল আলোচিত বিষয়।

সাবেক শাসকগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া ও প্রতিহিংসা রাজনীতি। আসাদ-উত্তর সরকারের অধীনে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও সংখ্যালঘু সুরক্ষার প্রশ্নগুলো আন্তর্জাতিক মহল কতটা নজরে রাখবে, তা নিয়েও সংশয় আছে। অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পেলে মানবাধিকার প্রশ্ন পেছনে পড়ে যাওয়ার নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল নয়।

আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া। ইরান, রাশিয়া কিংবা অন্য আঞ্চলিক শক্তি এই পরিবর্তনকে কীভাবে নেবে, তা পুরো অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি রাষ্ট্রের ‘কলঙ্কমুক্তি’ (de-stigmatization) প্রক্রিয়া কখনোই শুধু আইনি বা প্রশাসনিক ঘোষণায় সম্পূর্ণ হয় না। তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়া একটি প্রতীকী ও কাঠামোগত সূচনা মাত্র—প্রকৃত রূপান্তর নির্ভর করে সিরিয়ার সমাজ কীভাবে যুদ্ধ-পরবর্তী ট্রমা, বিভাজন ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি কাটিয়ে নতুন রাষ্ট্রকাঠামোয় আস্থা তৈরি করতে পারে, তার ওপর।

সংক্ষেপে বলা যায়, এই সিদ্ধান্ত সিরিয়ার জন্য একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের জানালা খুলে দিয়েছে কিন্তু এটি কোনো নিশ্চয়তা নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলায় আজকের মিত্র আগামীকাল আবার প্রান্তিক হয়ে যেতে পারে, যদি ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সমীকরণ বদলায়। সিরিয়ার প্রকৃত পুনর্গঠন নির্ভর করবে এই বাহ্যিক স্বীকৃতিকে অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিতে রূপান্তরিত করার সক্ষমতার ওপর।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

বিশ্ব

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল থমকে, গভীর হচ্ছে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংকট

স্থবির কূটনীতি ও ট্যাংকারে হামলায় হরমুজে জাহাজ চলাচল কমেছে, চাপে তেলের বাজার এবং বাড়ছে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা।

২ মিনিটের পড়া

বিশ্ব

যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ ভঙ্গুর, গাজায় গভীরতর হচ্ছে মানবিক সংকট

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে নতুন সহিংসতা, ত্রাণ সংকট, বাস্তুচ্যুতি ও মৌলিক সেবার ঘাটতিতে গাজার মানবিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে।

৩ মিনিটের পড়া

প্রযুক্তি

এআই ঘিরে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, বাড়ছে জাতীয় কৌশল

চিপ, কম্পিউটিং শক্তি, দক্ষ জনবল, ডেটা ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করে এআই প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।

৩ মিনিটের পড়া

রাজনীতি

মক্কা চুক্তিতে যোগদানের ভাবনা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বিতর্ক

মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা দেশটির দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

২ মিনিটের পড়া