যুদ্ধক্ষেত্রের চাপেও রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনায় মিলছে না সমাধান
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও ভূখণ্ড, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, যুদ্ধের তীব্রতা ও গভীর অবিশ্বাস দুই পক্ষকে এখনো দূরে রেখেছে।

রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর চার বছরেরও বেশি সময় পর যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও একটি টেকসই সমঝোতা এখনো অধরা। ইউক্রেন আলোচনার পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে রাশিয়াও মস্কোর কাছে গ্রহণযোগ্য শর্তে সংঘাত নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে।
তবে সমস্যাটি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—আলোচনায় বসতে প্রস্তুত থাকা আর আপস করতে প্রস্তুত থাকা এক বিষয় নয়।
সমঝোতার কাঠামো ছাড়াই চলছে কূটনৈতিক যোগাযোগ
ইউক্রেন কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাও রয়েছে। চলতি মাসে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে কিয়েভ যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকদের কাছে নিজেদের প্রস্তাব দিয়েছে।
মস্কো ও কিয়েভকে কাছাকাছি আনতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে কাজটি কঠিন, কারণ সংঘাতের মূল বিষয়গুলোতে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো ব্যাপকভাবে ভিন্ন।
ইউক্রেনের কাছে যেকোনো সমঝোতার কেন্দ্রে রয়েছে সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা। অন্যদিকে রাশিয়ার দাবিগুলোর সঙ্গে কিয়েভের অবস্থানের মৌলিক বিরোধ রয়েছে, বিশেষ করে ভূখণ্ড এবং ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান নিয়ে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে আগের কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো সাধারণ নীতিগত আলোচনার পর্যায় থেকে সংঘাতের মূল রাজনৈতিক প্রশ্নে সমঝোতার দিকে এগোতে পারেনি।
যুদ্ধক্ষেত্র এখনো আলোচনার টেবিলকে প্রভাবিত করছে
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
১৮ আগস্ট ইউক্রেন পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে অন্যতম বৃহৎ ড্রোন হামলা চালায়। প্রায় ৮০০টি ড্রোন রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের লক্ষ্যবস্তুতে পাঠানো হয় বলে জানা যায়। একই সময়ে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যায়। খারকিভ অঞ্চলে একটি হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হয়।
এই উত্তেজনা আলোচকদের সামনে থাকা মূল বৈপরীত্যকে তুলে ধরে। দুই পক্ষই সামরিক চাপের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, আবার একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও চালু রাখছে।
কিয়েভের জন্য সামরিক চাপ আলোচনায় দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। মস্কোর জন্যও যুদ্ধক্ষেত্রে অভিযান অব্যাহত রাখা ভবিষ্যৎ সমঝোতার আগে আরও বেশি ছাড় আদায়ের উপায় হতে পারে।
এ কারণেই তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক অগ্রগতি কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইউরোপও সমাধানের অংশ হতে চায়
ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ইউরোপের বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলোরও আলোচনায় বড় স্বার্থ রয়েছে।
ইউরোপীয় সরকারগুলো এমন একটি সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা শুধু যুদ্ধ থামিয়ে ইউক্রেনকে ভবিষ্যৎ রুশ আক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলে রাখবে না। নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রশ্নটি তাই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানোর বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা ছাড়া একটি যুদ্ধবিরতি ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় অংশীদারদের আবারও একই কৌশলগত সংকটে ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোকে কিয়েভের প্রতি সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখার সঙ্গে মস্কোর সঙ্গে বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকির ভারসাম্যও বজায় রাখতে হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে, ব্রিটেন ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার কারণে মস্কো লন্ডনকে সতর্ক করেছে।
পুতিন-জেলেনস্কি সরাসরি বৈঠক কেন কঠিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মুখোমুখি বৈঠক হলে তার বড় প্রতীকী গুরুত্ব থাকত। কিন্তু এমন বৈঠক একাই সংঘাতের মৌলিক বিরোধগুলোর সমাধান করতে পারবে না।
প্রধান বাধাগুলো হলো:
ভূখণ্ড: ইউক্রেন শান্তির বিনিময়ে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে মস্কো তার ভূখণ্ডগত দাবির স্বীকৃতি চায়।
নিরাপত্তা নিশ্চয়তা: ভবিষ্যতে আরেকটি রুশ আক্রমণ ঠেকাতে কিয়েভ বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা চায়।
সামরিক অবস্থান: যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো পক্ষই মনে করতে চায় না যে আলোচনায় বসে তারা নিজেদের সুবিধা হারাচ্ছে।
অবিশ্বাস: বছরের পর বছর যুদ্ধ ও ব্যর্থ কূটনৈতিক উদ্যোগ দুই পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বৈধতা: যেকোনো সমঝোতাই ইউক্রেন, রাশিয়া ও ইউরোপজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক পর্যালোচনার মুখে পড়বে।
ফলে দুই পক্ষ যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে আলোচনা করলেও শান্তি আসলে কেমন হবে, সে প্রশ্নে তাদের অবস্থান এখনো অনেক দূরে।
ছোট সমঝোতা থেকেই কি পথ খুলতে পারে
একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি এখনো কঠিন হলেও ছোট পরিসরের সমঝোতা ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে পারে।
কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক জাহাজে হামলা বন্ধের জন্য ইউক্রেন সম্প্রতি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পারস্পরিক উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছিল। এর পেছনে ছিল শস্য রপ্তানিতে ক্রমবর্ধমান বিঘ্নের আশঙ্কা। তবে রাশিয়া সীমিত কৃষ্ণসাগর যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এতে বোঝা যায়, সীমিত আস্থাবর্ধক ব্যবস্থাও কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে।
তারপরও এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বেসামরিক জাহাজে হামলা বন্ধ, বন্দি বিনিময় বাড়ানো কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার মতো ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমাতে পারে, যদিও এর মাধ্যমে মস্কো ও কিয়েভকে একসঙ্গে সব ভূখণ্ডগত ও রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান করতে হবে না।
কূটনীতি যদি শুধু ধারাবাহিক বৈঠক ও প্রস্তাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব সমাধানের দিকে যেতে চায়, তাহলে আলোচকদের একটি যাচাইযোগ্য যুদ্ধবিরতি, লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা, ভূখণ্ডসংক্রান্ত সমঝোতা, ইউক্রেনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং অমীমাংসিত রাজনৈতিক প্রশ্ন সমাধানের একটি প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে।
এসব উপাদান একে অন্যের থেকে আলাদা নয়।
নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া যুদ্ধবিরতি সাময়িক হতে পারে। ইউক্রেনের সম্মতি ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তা গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে। আর বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া ভূখণ্ডগত ব্যবস্থা শুধু সংঘাতকে ভবিষ্যতের জন্য পিছিয়ে দিতে পারে।
তাই বর্তমান কূটনৈতিক পর্যায়ের মূল্যায়ন শুধু নেতারা একই কক্ষে বসছেন কি না, তার ভিত্তিতে করা উচিত নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—মস্কো, কিয়েভ, ওয়াশিংটন এবং ইউরোপীয় সরকারগুলো কি ধীরে ধীরে তাদের কাঙ্ক্ষিত শান্তি এবং বাস্তবে যে শান্তি মেনে নিতে প্রস্তুত, তার মধ্যকার দূরত্ব কমাতে পারছে?
এই মুহূর্তে সেই দূরত্ব এখনো যথেষ্ট বড়।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
রোহিঙ্গা সংকট ও সংস্কার এজেন্ডা নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যাচ্ছে বাংলাদেশ
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, গণতান্ত্রিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে সামনে রেখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ।
গাজা সংকট: যুদ্ধ ও কূটনীতির মাঝখানে আটকে পড়া সাধারণ মানুষ
জাতিসংঘ বলছে, গাজায় মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে, আর যুদ্ধবিরতির কূটনীতি এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পর্যাপ্ত স্বস্তি পৌঁছে দিতে পারেনি।
এআই ঘিরে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, বাড়ছে জাতীয় কৌশল
চিপ, কম্পিউটিং শক্তি, দক্ষ জনবল, ডেটা ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করে এআই প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
সিরিয়া সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা তালিকার বাইরে: একটি রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম, নাকি ভূরাজনীতির নতুন খেলা?
৪৭ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যা দেশটির জন্য নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।




