হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল থমকে, গভীর হচ্ছে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংকট
স্থবির কূটনীতি ও ট্যাংকারে হামলায় হরমুজে জাহাজ চলাচল কমেছে, চাপে তেলের বাজার এবং বাড়ছে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা স্থবির থাকার মধ্যেই হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার মাত্র পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করে এবং রোববার কোনো জাহাজের চলাচল রেকর্ড হয়নি। ট্যাংকারে হামলা ও ওয়াশিংটন-তেহরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকিতে পরিণত করেছে।
হরমুজ এখন সংঘাতের প্রধান কেন্দ্র
বর্তমান জাহাজ চলাচলের হার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১৩০টিরও বেশি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করত। বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশও ঐতিহাসিকভাবে এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি—ADNOC-এর তিনটি ট্যাংকারে হামলার অভিযোগ করেছে। ১৪ আগস্ট দুটি ট্যাংকার হামলার শিকার হওয়ার পর আরও একটি ADNOC জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ ওঠে।
জাহাজ চলাচলের এই পতন হরমুজকে সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাপ প্রয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
কূটনীতিতে অগ্রগতি নেই
হরমুজ পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালুর বিষয়ে এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, তেহরান আবার শান্তি আলোচনা শুরু করবে কি না সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। একই সঙ্গে হরমুজে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল শুরুর আগে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বিভিন্ন ছাড় দাবি করছে ইরান।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংঘাত চলতে থাকলে মার্কিন নাগরিকদের উচ্চ জ্বালানি মূল্যের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। তাঁর প্রশাসন ইরানের রাজস্ব ও সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে আরও নিষেধাজ্ঞার কথাও বিবেচনা করছে।
ফলে সংঘাতটি এখন শুধু সামরিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা এবং জ্বালানি বাজারে প্রবেশাধিকারও ইরান–যুক্তরাষ্ট্র বিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তেলের বাজারে চাপ বাড়ছে
হরমুজের পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৮.৫৫ ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট প্রায় ৮২.২৬ ডলার ছিল। আগের সপ্তাহে জ্বালানি অবকাঠামো ও ট্যাংকারে হামলার পর উভয় সূচকই ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
এশিয়ার শেয়ারবাজারেও বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট নিয়ে সতর্ক রয়েছেন। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, যা আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াবে।
তবে বাজার এখনো বড় ধরনের ধাক্কার অপেক্ষায় রয়েছে। কারণ ব্যবসায়ীরা দেখছেন, সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তব সংকট তৈরি হয় কি না। হরমুজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত আরও কঠিন হতে পারে।
বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা
ঝুঁকি শুধু হরমুজে সীমাবদ্ধ নয়। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের ঘোষিত অবরোধের কারণে বাব আল-মান্দাব প্রণালীতেও জাহাজ চলাচল কমেছে, যা আঞ্চলিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছে। একই সময়ে ইরান, কাতার ও ইয়েমেনকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা আঞ্চলিক সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
এখন মূল প্রশ্ন, সমুদ্রপথের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেওয়ার আগেই ওয়াশিংটন ও তেহরান কূটনীতিতে ফিরতে পারবে কি না। বিশ্ববাজার, সরকার ও জাহাজ পরিচালনাকারীদের কাছে হরমুজ তাই শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নয়; এটি হয়ে উঠেছে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত কতটা সীমাবদ্ধ থাকবে, তার একটি বড় পরীক্ষা।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
হরমুজ নিয়ে ইরানের শর্ত বহাল, আঞ্চলিক ঝুঁকিতে বাড়ল তেলের দাম
হরমুজ খুলে দেওয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়ের শর্ত জুড়ে দেওয়া এবং নতুন হামলায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে।
সিরিয়া সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা তালিকার বাইরে: একটি রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম, নাকি ভূরাজনীতির নতুন খেলা?
৪৭ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যা দেশটির জন্য নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যেতে ট্রাম্পকে এরদোয়ানের আহ্বান
ইরানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখতে ট্রাম্পকে আহ্বান জানিয়েছেন এরদোয়ান এবং শান্তি প্রচেষ্টায় তুরস্কের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ ভঙ্গুর, গাজায় গভীরতর হচ্ছে মানবিক সংকট
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে নতুন সহিংসতা, ত্রাণ সংকট, বাস্তুচ্যুতি ও মৌলিক সেবার ঘাটতিতে গাজার মানবিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে।




