মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

প্রযুক্তি

এআই ঘিরে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, বাড়ছে জাতীয় কৌশল

চিপ, কম্পিউটিং শক্তি, দক্ষ জনবল, ডেটা ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করে এআই প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।

TBB Newsroom ·

ভূরাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসছে এআই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্রমেই জাতীয় কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে। উন্নত এআই তৈরি ও ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে বিভিন্ন সরকার এখন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

এই প্রতিযোগিতা আর শুধু পৃথক প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সরকারগুলো কম্পিউটিং সক্ষমতা, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা, দক্ষ জনবল, ক্লাউড অবকাঠামো এবং এআই মডেলে প্রবেশাধিকারকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখছে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ এআই ইনডেক্স এই ধারণাকে ‘এআই সার্বভৌমত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর অর্থ হলো একটি দেশের নিজস্ব এআই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ—কম্পিউটিং, মডেল, দক্ষ জনবল, ডেটা ও প্রযুক্তির ব্যবহার—স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা।

এআই যে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, সরকারি সেবা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সাইবার নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে, এই উপলব্ধিই এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে।

সুবিধা পেতে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রে এআই নেতৃত্বকে স্থান দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের এআই অ্যাকশন প্ল্যানে উদ্ভাবন, অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে ৯০টির বেশি নীতিগত পদক্ষেপ রয়েছে।

এই পরিকল্পনায় মিত্র দেশগুলোর কাছে মার্কিন এআই প্রযুক্তি রপ্তানির উদ্যোগও রয়েছে। ফলে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক প্রভাবের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।

২০২৬ সালের জুনে হোয়াইট হাউস জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের গতি বাড়ানো এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নত এআই সক্ষমতা ব্যবহারের নির্দেশ দেয়।

চীনও নিজস্ব বিস্তৃত জাতীয় কৌশল গ্রহণ করছে। বেইজিংয়ের ‘এআই+’ কৌশলের লক্ষ্য বিজ্ঞান, শিল্প, ভোগ, সরকারি সেবা ও শাসনব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানো।

চীনা নীতিতে ২০২৭ সালের মধ্যে ছয়টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশের বেশি বুদ্ধিমান টার্মিনাল ও এজেন্ট ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য ৯০ শতাংশের ওপরে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ফলে প্রতিযোগিতাটি শুধু শক্তিশালী এআই মডেল তৈরির নয়; এগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলারও।

ইউরোপ ও মধ্যম শক্তিগুলোর স্বনির্ভরতার চেষ্টা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভিন্ন একটি পথ অনুসরণ করছে। তারা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধিকে একত্র করছে।

ইইউর এআই কনটিনেন্ট কৌশলে কম্পিউটিং অবকাঠামো, ডেটা, দক্ষতা, এআই গ্রহণ এবং শাসনব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ ইইউ জানায়, তাদের ১৯টি এআই ফ্যাক্টরি এবং ১৩টি এআই ফ্যাক্টরি অ্যান্টেনা চালু ছিল।

ইউরোপীয় ব্লক এআই সক্ষমতাকে প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের অংশ হিসেবেও বিবেচনা করছে। তাদের সাইবার নিরাপত্তা পরিকল্পনায় সার্বভৌম এআই সক্ষমতায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।

অন্য দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা এড়ানোর চেষ্টা করছে। উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিল প্রায় ৪৪৪ মিলিয়ন ডলার এআই অবকাঠামো বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতা বজায় রাখতে চীনা ও মার্কিন প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের মধ্যে বড় প্রকল্প ভাগ করেছে।

চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দেশগুলোকে এআই প্রতিযোগিতায় পক্ষ বেছে নিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে এবং ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’-এর ধারণাকে সামনে এনেছে।

প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে বিদ্যুৎ ও সম্পদ

এআই ঘিরে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাস্তব অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। উন্নত এআইয়ের জন্য বিপুল কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন, যার জন্য দরকার ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, নেটওয়ার্ক এবং দক্ষ কর্মী।

সাম্প্রতিক একটি একাডেমিক বিশ্লেষণে বিদ্যুৎ, পানি, ডেটা ও দক্ষ জনবলকে এআই প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এআই ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের বিস্তারের সঙ্গে ডেটা সেন্টারের চাহিদা বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়াও এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ডেটা সেন্টার নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে।

উদীয়মান এআই প্রতিযোগিতা তাই অ্যালগরিদমের পাশাপাশি অবকাঠামো ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণেরও প্রতিযোগিতা।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় প্রশ্ন হলো, বিদেশি প্রযুক্তির ওপর স্থায়ী নির্ভরতা তৈরি না করে কীভাবে এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে অংশ নেওয়া যায়।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ

এআই মডেল তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা না করেও বাংলাদেশ এই প্রযুক্তি থেকে সুবিধা নিতে পারে। জাতীয় কৌশলের ক্ষেত্রে স্থানীয় সক্ষমতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

এর মধ্যে এআই দক্ষতা, স্থানীয় ভাষার মডেল ও ডেটাসেট, ডিজিটাল সরকারি সেবা, সাইবার নিরাপত্তা, গবেষণা সক্ষমতা, সাশ্রয়ী কম্পিউটিং এবং একাধিক প্রযুক্তি সরবরাহকারীর সঙ্গে অংশীদারত্ব অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

মূল কৌশলগত উদ্বেগ হলো নির্ভরতা। এআই মডেল, চিপ, ক্লাউড সেবা ও কম্পিউটিং অবকাঠামো যদি অল্প কয়েকটি দেশ ও কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রযুক্তির বিকাশে ভূমিকা রাখার পরিবর্তে প্রধানত প্রযুক্তির ভোক্তায় পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য তাই এআই প্রতিযোগিতা একই সঙ্গে একটি সুযোগ ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ: নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করা এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও দক্ষতার প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত থাকা।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

মতামত

এআই কাজ, সম্পদ ও অর্থনীতির ধারণা বদলে দিতে পারে: ইলন মাস্ক

ইলন মাস্কের মতে, উন্নত এআই ও রোবোটিক্স মানবশ্রমের গুরুত্ব কমিয়ে সম্পদ সৃষ্টির নতুন অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে।

৩ মিনিটের পড়া

মতামত

সিরিয়া সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা তালিকার বাইরে: একটি রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম, নাকি ভূরাজনীতির নতুন খেলা?

৪৭ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যা দেশটির জন্য নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।

৪ মিনিটের পড়া

প্রযুক্তি

ডিপফেক ও এআই স্বচ্ছতায় কঠোর নিয়ম কার্যকর করছে ইউরোপ

২ আগস্ট থেকে ইইউ এআই আইন প্রয়োগের নতুন পর্যায়ে গেছে, যেখানে ডিপফেক, এআই কনটেন্ট ও শক্তিশালী এআই মডেল নজরদারিতে রয়েছে।

৩ মিনিটের পড়া

বিশ্ব

উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক পরিসর খুঁজছে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া

পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সংলাপ চায় ওয়াশিংটন; বেইজিং সিউলকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছে।

৪ মিনিটের পড়া