মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

রাজনীতি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ফের অনিশ্চয়তা, মিয়ানমারের পরিসংখ্যান প্রত্যাখ্যান ঢাকার

রোহিঙ্গা যাচাই, পরিচয় ও রাখাইনের নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধের মধ্যেই মিয়ানমারের নতুন পরিসংখ্যান প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ।

Jubayer Ahmed ·

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমারের সর্বশেষ বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। ঢাকার অভিযোগ, মিয়ানমার ভুল পরিসংখ্যান ব্যবহার করেছে এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়েও তাদের বক্তব্য সঠিক নয়।

মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করা হয়েছে।

মিয়ানমারের বক্তব্য অনুযায়ী, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হতে পারে। তবে বাংলাদেশ বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার আওতায় যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং জাতিসংঘের ব্যবস্থায় নিবন্ধিত তথ্যকেই বাংলাদেশে অবস্থানরত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সঠিক হিসাব হিসেবে তুলে ধরেছে।

সম্ভাবনার ইঙ্গিত, তবে অগ্রগতি এখনও সীমিত

রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গার যাচাই সম্পন্ন হওয়াকে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় একটি সম্ভাব্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তবে যাচাই সম্পন্ন হওয়া মানেই নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত হওয়া নয়।

মিয়ানমার যাচাই করা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের সঙ্গে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির শর্ত যুক্ত করেছে। সেখানে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের কারণে নিরাপত্তা এখনও প্রত্যাবাসনের অন্যতম প্রধান বাধা।

সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দুই পক্ষের মতপার্থক্যের মাত্রাও স্পষ্ট হয়েছে। মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশের পাঠানো তালিকার ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনকে তারা যাচাই করতে পারেনি। একই সঙ্গে তালিকায় থাকা ৪ হাজার ২৪১ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও করেছে তারা।

বাংলাদেশের জন্য তাই চ্যালেঞ্জ শুধু কিছু ব্যক্তির নাম অনুমোদন করানো নয়। বৃহত্তর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।

পরিচয়ের প্রশ্নে এখনও মতবিরোধ

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতবিরোধ শুধু জনসংখ্যার পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়।

মিয়ানমার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের “বাঙালি” হিসেবে যে পরিচয় তুলে ধরেছে, বাংলাদেশ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ঢাকার অবস্থান হলো, রোহিঙ্গারা একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী, যাদের শিকড় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে।

এই পরিচয়ের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রত্যাবাসনের পর নাগরিকত্ব, আইনি মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার—সবকিছুর সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত।

নাগরিকত্ব বা আইনি মর্যাদা, চলাচলের স্বাধীনতা, শারীরিক নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন বাস্তুচ্যুত মানুষের সমস্যার স্থায়ী সমাধান নাও হতে পারে।

এ কারণে যাচাই প্রক্রিয়াকে কেবল প্রশাসনিক কাজ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মিয়ানমার যেভাবে প্রত্যাবাসনের যোগ্য ব্যক্তিদের পরিচয় ও মর্যাদা নির্ধারণ করবে, তা তাদের ভবিষ্যৎ অধিকার ও সুরক্ষার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

নিরাপত্তা, মানবিক চাপ ও সামনে পথ

মিয়ানমারের বক্তব্য অনুযায়ী, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন এগিয়ে নেওয়া কঠিন। রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত সেই উদ্বেগের বাস্তব ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী অনিরাপত্তা যেন প্রত্যাবাসন বিলম্বের অনির্দিষ্ট কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, সেটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশ মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপের মুখে রয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে ১১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছিলেন।

সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, শরণার্থী শিবির ও আশপাশের জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ তত বাড়তে পারে। জীবনযাত্রার অবনতি, সীমিত সুযোগ এবং হতাশা অনিয়মিত অভিবাসন ও বৃহত্তর অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গ অগ্রগতি নয়, আবার সম্পূর্ণ অচলাবস্থাও নয়; এটি একটি সীমিত কূটনৈতিক সুযোগ।

ঢাকা ও নেপিডোর তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত যাচাই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা।

তবে টেকসই সমাধানের জন্য শুধু নামের তালিকা বিনিময় যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা, পরিচয়, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকার সুযোগ এবং পুনরায় নিপীড়নের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা—এসব বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং শরণার্থীদের অনিরাপদ পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে বাধ্য না করার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে।

বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের সর্বশেষ যাচাই তাই একটি সীমিত কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ রোহিঙ্গাদের জন্য সত্যিকারের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করবে, নাকি প্রায় এক দশক ধরে চলা সংকটের আরেকটি স্থবির অধ্যায়ে পরিণত হবে—তা নির্ভর করবে যাচাইয়ের বাইরে মিয়ানমার কী ধরনের বাস্তব নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে প্রস্তুত তার ওপর।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

রাজনীতি

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে আয় কমে ৮৬২ কোটি টাকায় নেমেছে

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত সরকারি তথ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ধারাবাহিক হ্রাসের চিত্র উঠে এসেছে।

২ মিনিটের পড়া

রাজনীতি

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মানবিক সহায়তার প্রস্তাব বাংলাদেশের

প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ।

২ মিনিটের পড়া

রাজনীতি

মক্কা চুক্তিতে যোগদানের ভাবনা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বিতর্ক

মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা দেশটির দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

২ মিনিটের পড়া

ধরিত্রী

বর্ষার তাণ্ডবে বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, বাড়ছে ঝুঁকি

টানা বর্ষণ ও নদীর পানি বাড়ায় বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে।

৩ মিনিটের পড়া