মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

রাজনীতি

নতুন বেতন কাঠামো, মূল্যস্ফীতি ও কর সংস্কার: জীবনযাত্রার ব্যয় কি কমবে?

নতুন বেতন কাঠামো ও কর সংস্কার মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর চেষ্টা হলেও স্থায়ী স্বস্তি নির্ভর করবে মূল্য নিয়ন্ত্রণের ওপর।

Jubayer Ahmed ·

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একই সময়ে অনেক পরিবারের আয় সেই হারে বাড়েনি। এই প্রেক্ষাপটে সরকার নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করেছে, আয়কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে এবং সম্পদ কর পুনর্বহালের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং রাষ্ট্রের রাজস্বভিত্তি শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব সংস্কার সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তব স্বস্তি বয়ে আনবে, নাকি কেবল মূল্যস্ফীতির প্রভাব আংশিকভাবে সামাল দেবে।

মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো পুরোপুরি কমেনি

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতির গতি কিছুটা কমলেও তা এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.৩২ শতাংশ, আর গড় মজুরি প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.২২ শতাংশ

এই ব্যবধান খুব বেশি না হলেও এর অর্থ হলো, পণ্যের দাম এখনো মানুষের আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। ফলে নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে।

বিশেষ করে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার ব্যয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে বড় চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক পরিবারকে সঞ্চয় কমাতে বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় সীমিত করতে হচ্ছে।

নতুন বেতন কাঠামোতে কী পরিবর্তন আসছে

সরকার ঘোষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে এসেছে। সরকার বলছে, নিম্ন বেতনধারী কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ২০,০০১ থেকে ৩০,০০০ টাকা বেতনধারীরা ৬৫ শতাংশ এবং ৩০,০০১ থেকে ৪০,০০০ টাকা বেতনধারীরা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি পাবেন। উচ্চ বেতন গ্রেডে শতাংশের হিসেবে বৃদ্ধি তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে।

এর লক্ষ্য হলো নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের মূল্যস্ফীতির ধাক্কা থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া এবং তাদের দৈনন্দিন ব্যয় সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো।

তবে এই সুবিধা মূলত সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য। বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী মানুষের ক্ষেত্রে এমন কোনো স্বয়ংক্রিয় বেতন সমন্বয় নেই।

কর সংস্কার ও সম্পদ করের আলোচনা

নতুন বেতন কাঠামোর পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের বাজেটে আয়কর ব্যবস্থায়ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা করা, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক করদাতার ওপর করের চাপ কমাতে পারে। একই সঙ্গে সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগও চালু করা হয়েছে।

আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো উচ্চমূল্যের সম্পদের ওপর সম্পদ কর পুনর্বহালের সম্ভাবনা। নীতিনির্ধারকদের মতে, এটি রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি কর ব্যবস্থাকে আরও প্রগতিশীল করতে পারে।

সমর্থকদের মতে, এতে ধনী ব্যক্তিদের ওপর করের দায়িত্ব বাড়বে এবং আয় বৈষম্য কমাতে সহায়তা করবে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, বাস্তবায়ন স্বচ্ছ না হলে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বেশি বেতন কি আবার মূল্যস্ফীতি বাড়াবে?

অর্থনীতিবিদদের মতামত এ ক্ষেত্রে একরকম নয়। একদিকে বেতন বৃদ্ধি মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা বাড়ায়, অন্যদিকে বাজারে চাহিদাও বৃদ্ধি পায়।

যদি উৎপাদন ও সরবরাহ একই হারে না বাড়ে, তাহলে অতিরিক্ত চাহিদা আবার মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। তাই রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেতন বাড়ালেই জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের সমাধান হবে না। বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, খাদ্যদ্রব্যের দামের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কার্যকর করাও সমান জরুরি।

সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ কী

সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামোর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন। মধ্যম আয়ের করদাতারাও করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধির কারণে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।

কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবী, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, দিনমজুর ও পেনশনভোগীদের জন্য সরাসরি সুবিধা সীমিত থাকতে পারে, যদি না বেসরকারি খাতেও মজুরি বৃদ্ধি ঘটে।

বাংলাদেশের নতুন বেতন কাঠামো ও কর সংস্কার মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদি চাপ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর রাজস্ব আদায়, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরির ওপর, যেখানে মানুষের আয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের চেয়ে দ্রুত বাড়তে পারে।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

অর্থনীতি

উচ্চ এলএনজি দামে বাংলাদেশের শিল্প প্রবৃদ্ধিতে ফের চাপ

ব্যয়বহুল আমদানি করা এলএনজি শিল্প, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সরকারি অর্থে চাপ বাড়াচ্ছে; বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজছে ঢাকা।

৪ মিনিটের পড়া

প্রতিবেদন

বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট: প্রবৃদ্ধি কি যথেষ্ট চাকরি তৈরি করছে?

তরুণ কর্মশক্তি বাড়লেও দক্ষতার ঘাটতি ও সীমিত কর্মসংস্থান শিক্ষা থেকে চাকরিতে প্রবেশের পথকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।

৪ মিনিটের পড়া

অর্থনীতি

বাংলাদেশে সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে করের বোঝা কমে ১ শতাংশ, মেয়াদ ১৮০ দিন

বাংলাদেশে যোগ্য সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে করের কার্যকর বোঝা প্রায় ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে ১৮০ দিনের জন্য।

৩ মিনিটের পড়া

রাজনীতি

রোহিঙ্গা সংকট ও সংস্কার এজেন্ডা নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যাচ্ছে বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, গণতান্ত্রিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে সামনে রেখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ।

২ মিনিটের পড়া