বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট: প্রবৃদ্ধি কি যথেষ্ট চাকরি তৈরি করছে?
তরুণ কর্মশক্তি বাড়লেও দক্ষতার ঘাটতি ও সীমিত কর্মসংস্থান শিক্ষা থেকে চাকরিতে প্রবেশের পথকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।

বাংলাদেশে শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে একটি বড় তরুণ কর্মশক্তি। কিন্তু স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করলেই এখন আর চাকরিতে প্রবেশের নিশ্চয়তা মিলছে না। কর্মজীবনে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা এই প্রজন্মের জন্য মূল প্রশ্নটি এখন শুধু চাকরি আছে কি না—বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তাদের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে কি না।
সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য সমস্যাটির ব্যাপ্তি তুলে ধরে। প্রায় প্রতি পাঁচজন তরুণের একজন—প্রায় ৮৬ লাখ—কাজ, পড়াশোনা বা কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণের কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নয়। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ২০২৪ সালে বেকারত্ব ৮ শতাংশের বেশি ছিল। একই সময়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার ছিল ১৩.৫ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান শুধু বেকারত্বের চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দক্ষতার অসামঞ্জস্যেরও ইঙ্গিত দেয়।
ডিগ্রি থাকলেই চাকরি নিশ্চিত হচ্ছে না
বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ অনেক তরুণের জন্য প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন হয়ে উঠছে।
উচ্চশিক্ষার বিস্তারের ফলে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু নিয়োগদাতারা প্রায়ই এমন ব্যবহারিক, কারিগরি ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক দক্ষতা চান, যা প্রচলিত শিক্ষা কার্যক্রমে সব সময় পর্যাপ্তভাবে তৈরি হয় না। ফলে শিক্ষার হার বাড়লেও উপযুক্ত কর্মসংস্থান একই গতিতে বাড়ছে না।
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট। ২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার ছিল ১৩.৫ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২০ শতাংশ।
এখানে একটি কঠিন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—তরুণদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ছে, কিন্তু তাদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ সব সময় তৈরি হচ্ছে না।
চ্যালেঞ্জটি এখন শুধু শিক্ষিত তরুণ তৈরি করা নয়; এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করা, যেখানে সেই তরুণদের দক্ষতাকে উৎপাদনশীলভাবে কাজে লাগানো যায়।
শুধু চাকরি নয়, ভালো চাকরিও দরকার
শ্রমবাজারে কতগুলো চাকরি তৈরি হচ্ছে, তার পাশাপাশি সেই চাকরিগুলোর মানও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তি, অটোমেশন, সেবা খাত এবং ব্যবসার পরিবর্তিত ধরন নিয়োগদাতাদের প্রত্যাশিত দক্ষতাও বদলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রচলিত খাতগুলোর গুরুত্বও রয়ে গেছে।
প্রতি বছর প্রায় ১৪ লাখ মানুষ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারেন, ফলে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে। বেকারত্বের বাইরে অনেক তরুণ অনানুষ্ঠানিক, অস্থায়ী বা কম উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
এসব কাজ তাৎক্ষণিক আয় দিতে পারে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে চাকরির নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ বা ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ সীমিত। ফলে একজন তরুণ কর্মরত থাকলেও যদি তার আয় টেকসই না হয় কিংবা দক্ষতা বিকাশের সুযোগ না থাকে, তাহলে তার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
তাই বাংলাদেশের কর্মসংস্থান নীতিতে শুধু কতটি চাকরি তৈরি হচ্ছে তা নয়, উৎপাদনশীলতা, মজুরি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের সুযোগকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেন সমস্যার সমাধান করছে না
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, কিন্তু প্রবৃদ্ধি নিজে থেকেই পর্যাপ্ত মর্যাদাপূর্ণ চাকরি নিশ্চিত করে না।
অর্থনীতির কোন খাতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ যদি এমন খাতে বেশি কেন্দ্রীভূত হয় যেখানে কর্মসংস্থান তুলনামূলক কম তৈরি হয়, তাহলে অর্থনীতি বাড়তে পারে, কিন্তু বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থানে প্রবেশ কঠিনই থেকে যেতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে তাই দুটি সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ রয়েছে—উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ব্যবসা ও শিল্পখাতকে বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতা ও প্রণোদনা দেওয়া।
বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই দক্ষতার ব্যবধান কমাতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মৌলিক জ্ঞান দিতে পারে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাস্তব দক্ষতার চাহিদা জানাতে পারে এবং সরকারি সংস্থাগুলো এই ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে পারে।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সাফল্যও শুধু কতজন প্রশিক্ষণ শেষ করলেন, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। প্রশিক্ষণের পর কতজন টেকসই কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারলেন, সেটিই হওয়া উচিত গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
তরুণ জনসংখ্যাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা
বাংলাদেশের তরুণ জনসংখ্যা এখনো একটি বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। তবে জনসংখ্যাগত সুবিধা তখনই অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, যখন তরুণরা উৎপাদনশীলভাবে অর্থনীতিতে অংশ নিতে পারেন।
এ কারণে নীতিগত উদ্যোগকে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বাইরে যেতে হবে। তরুণদের নিয়োগ ও পুনরায় দক্ষ করে তোলার জন্য নিয়োগদাতাদের উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোকে বাস্তব শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তরুণ কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে নিয়োগদাতাদের উৎসাহিত করতে কর-সুবিধাসহ বিভিন্ন প্রণোদনার কথা উল্লেখ করেছে।
তরুণ বাংলাদেশিদের কাছে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত খুব ব্যক্তিগত। এটি সেই স্নাতকের গল্প, যিনি প্রথম চাকরির সাক্ষাৎকারের অপেক্ষায় আছেন; সেই তরুণীর গল্প, যিনি নিজের যোগ্যতার সঙ্গে মানানসই কর্মক্ষেত্র খুঁজে পাচ্ছেন না; অথবা সেই কর্মীর গল্প, যিনি সুযোগ পাওয়ার কারণে নিজের যোগ্যতার তুলনায় অনেক নিচের একটি চাকরি গ্রহণ করছেন।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ তাই শুধু অর্থনীতি কত দ্রুত বাড়ছে, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বিচার করতে হবে সেই প্রবৃদ্ধি কর্মজীবনে প্রবেশ করতে থাকা প্রজন্মের জন্য কতটা অর্থবহ সুযোগ তৈরি করছে, তা দিয়েও।
দেশের তরুণ কর্মশক্তি বড়। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রজন্ম যেন শিক্ষা, দক্ষতা ও উদ্যমকে উৎপাদনশীল কাজ এবং একটি টেকসই ভবিষ্যতে রূপ দিতে পারে।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
দক্ষতার ঘাটতিতে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে তরুণদের ওপর বাড়ছে চাপ
শিক্ষা ও চাকরির বাজারের চাহিদার ব্যবধান বাড়ায় তরুণ ও শিক্ষিতদের উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
উচ্চ এলএনজি দামে বাংলাদেশের শিল্প প্রবৃদ্ধিতে ফের চাপ
ব্যয়বহুল আমদানি করা এলএনজি শিল্প, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সরকারি অর্থে চাপ বাড়াচ্ছে; বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজছে ঢাকা।
নতুন বেতন কাঠামো, মূল্যস্ফীতি ও কর সংস্কার: জীবনযাত্রার ব্যয় কি কমবে?
নতুন বেতন কাঠামো ও কর সংস্কার মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর চেষ্টা হলেও স্থায়ী স্বস্তি নির্ভর করবে মূল্য নিয়ন্ত্রণের ওপর।
বোয়েসেলের মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার নতুন সমঝোতার আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে, যা নিরাপদ ও স্বচ্ছ শ্রম অভিবাসনের নতুন…



