জলবায়ু যখন মাথার ভেতর, দক্ষিণ এশিয়ার তাপ এখন অর্থনৈতিক সংকট
চরম তাপ দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও আয় ক্ষয় করছে, ফলে এটি আর শুধু আবহাওয়ার সমস্যা নয়—উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নও।

ঢাকা, ১৬ আগস্ট ২০২৬: চরম তাপ দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে কাজ, আয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ক্রমবর্ধমান বিঘ্ন তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের নতুন এক মূল্যায়ন বলছে, অতিরিক্ত তাপ ইতোমধ্যে প্রতি বছর এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সমপরিমাণ ক্ষতি করছে এবং কার্যকর অভিযোজন না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রায় ৭ শতাংশ কমে যেতে পারে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে এমন শ্রমিকদের ওপর, যাদের আয় দৈনিক শারীরিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। নির্মাণশ্রমিক, কৃষক, পরিবহনকর্মী, হকার ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য বিপজ্জনক তাপমাত্রার সময়ে কাজ বন্ধ করে ঘরে থাকা সবসময় বাস্তবসম্মত বিকল্প নয়।
তাপ এখন আর শুধু জলবায়ু ঝুঁকি নয়; এটি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঝুঁকিও।
তাপ যখন অর্থনৈতিক ধাক্কা
দক্ষিণ এশিয়ায় উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে দ্রুত নগরায়ণ, বড় অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার এবং সীমিত শীতলীকরণ সুবিধা একসঙ্গে কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বছরে অন্তত এক মাস বিপজ্জনক তাপমাত্রার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১২ কোটি থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে ৫২ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।
তাপ বিভিন্ন পথে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শ্রমিকের কাজের গতি কমে, কর্মঘণ্টা কমে যায়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। একই সঙ্গে পরিবারকে পানি, শীতলীকরণ ও স্বাস্থ্যসেবায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এই চাপ সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, একটি তাপপ্রবাহ অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের আয় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে, একই সময়ে তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়।
ফলে চরম তাপ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক বৈষম্যেরও প্রশ্ন। যাদের সঞ্চয় কম, সামাজিক সুরক্ষা দুর্বল এবং শীতল পরিবেশ বা নিরাপদ কর্মস্থলে প্রবেশাধিকার সীমিত, তারা তাপজনিত অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে বেশি সমস্যায় পড়ে।
বাংলাদেশের ওপর বাড়ছে চাপ
বাংলাদেশ এই সংকটের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চরম তাপ বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট করেছে এবং এর অর্থনৈতিক ক্ষতি আনুমানিক ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার, যা জিডিপির প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান।
এর প্রভাব তাৎক্ষণিক উৎপাদনশীলতার বাইরে যায়। উচ্চ তাপমাত্রা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়, কৃষি উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে এবং মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শীতলীকরণের জন্য বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করায় জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ায়।
বাংলাদেশের ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ বাইরের পরিবেশে এবং শারীরিক শ্রমনির্ভর। চরম তাপে নিরাপদে কাজ করার সময় কমে গেলে তার প্রভাব পরিবারগুলোর আয়, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও পৌঁছে যায়।
বিশ্বব্যাংকের আগের এক গবেষণাতেও বলা হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের জীবনযাত্রার মানে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি ৬.৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
নগরায়ণ, উৎপাদনশীলতা ও অভিযোজনের খরচ
চ্যালেঞ্জটি ক্রমেই শহরকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে শ্রমিক, ব্যবসা, পরিবহন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ঘনত্ব বেশি; অন্যদিকে কংক্রিটের আধিক্য ও সবুজ এলাকার ঘাটতি নগর তাপমাত্রা আরও বাড়াতে পারে।
ফলে অর্থনৈতিক ও জলবায়ু নীতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কমছে। আবাসন, পরিবহন, কর্মস্থল, জনপরিসর, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনায় তাপ সহনশীলতাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোর মধ্যে থাকতে পারে:
ছায়া, বৃক্ষ ও তাপসহনশীল জনপরিসর বাড়ানো।
নিরাপদ পানি ও শীতল পরিবেশে প্রবেশাধিকার উন্নত করা।
বিপজ্জনক তাপের সময়ে কর্মঘণ্টা পুনর্বিন্যাস করা।
তাপ সতর্কতা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
শুধু বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নির্ভর না করে জ্বালানি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণে বিনিয়োগ করা।
এসবকে শুধু জলবায়ু ব্যয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একজন শ্রমিককে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে পারা মানে একই সঙ্গে একটি পরিবারের আয় এবং অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা রক্ষা করা।
আবহাওয়ার সতর্কতা থেকে অর্থনৈতিক কৌশল
চরম তাপের অর্থনৈতিক ক্ষতি পরিমাপের পদ্ধতিও বদলানো প্রয়োজন। প্রচলিত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে হারানো কর্মঘণ্টা, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, অবৈতনিক পরিচর্যার কাজ এবং ধীরে ধীরে জমতে থাকা স্বাস্থ্যগত ক্ষতির পুরো চিত্র সবসময় ধরা পড়ে না।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার সামনে বড় কর্মসংস্থান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে কর্মক্ষম বয়সী প্রায় ২৮ কোটি অতিরিক্ত মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। একই সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি সেই শ্রমশক্তি ও খাতগুলোকেই ঝুঁকিতে ফেলছে, যাদের ওপর ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে।
তাই প্রশ্নটি এখন শুধু কীভাবে আরও গরম গ্রীষ্ম পার করা যায়, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন অর্থনীতি গড়ে তোলা যায়, যা আরও উষ্ণ জলবায়ুর মধ্যেও কার্যকরভাবে চলতে পারে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য তাপ সহনশীলতাকে এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শ্রমনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চরম তাপকে শুধু আবহাওয়াজনিত জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে দেখলে এর গভীরে তৈরি হওয়া উৎপাদনশীলতার সংকট ক্রমেই আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
উত্তপ্ত দক্ষিণ এশিয়া: চরম তাপমাত্রাই হয়ে উঠছে নতুন স্বাভাবিকতা
দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র গরম আরও ঘন ঘন ও আগেভাগে আসছে, বাড়ছে স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অবকাঠামোর ঝুঁকি।
নেপালে বন্যা দুর্যোগ আরও ভয়াবহ পর্যায়ে, বাড়ছে আঞ্চলিক ঝুঁকি
নেপালে হিমালয়জুড়ে বন্যা দুর্যোগ আরও জটিল হয়ে উঠেছে; বাড়ছে প্রাণহানি, নিখোঁজের সংখ্যা ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মানবিক সহায়তার প্রস্তাব বাংলাদেশের
প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ।
জুন ২০২৬ বিশ্বে রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন
জুনে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১৬.৫৪°C-এ পৌঁছায়; সমুদ্রের তাপমাত্রাও জুনের রেকর্ডে সর্বোচ্চ ছিল।




