সবাই যখন বিশেষজ্ঞ; বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংকট
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু যাচাইহীন আত্মবিশ্বাস মতামত ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সীমারেখাকে ক্রমেই অস্পষ্ট করছে।

১৩ই আগষ্ট, ২০২৬
ঢাকা।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে জনআলোচনাও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ১১ আগস্ট ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীরা অল্প সময়ের মধ্যে জটিল বিষয়ে মতামত প্রকাশ করছেন এবং তা বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে, অনেক ক্ষেত্রেই যেখানে প্রথাগত সংবাদমাধ্যম বা পেশাগত পর্যালোচনার মতো যাচাইয়ের ধাপ থাকে না।
মানুষের মতামত থাকা সমস্যা নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে মতের পার্থক্য ও প্রকাশ অপরিহার্য। সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখন, যখন ব্যক্তিগত মতামতকে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান বা প্রমাণ ছাড়াই বিশেষজ্ঞ মত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সবাই কথা বলতে পারেন, কিন্তু দক্ষতা সবার এক নয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্য ও কর্তৃত্বের প্রচলিত সম্পর্ককে বদলে দিয়েছে। আগে সংবাদ বা বিশ্লেষণ সাধারণত প্রতিবেদক, সম্পাদক, গবেষক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই কাঠামোর বড় অংশ সরিয়ে দিয়ে প্রায় যে কাউকে অর্থনৈতিক নীতি, আন্তর্জাতিক সংঘাত, বৈজ্ঞানিক গবেষণা কিংবা ইতিহাস নিয়ে নিজস্ব ব্যাখ্যা প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে।
প্রকাশের এই গণতন্ত্রীকরণ জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়েছে। কিন্তু প্রকাশের অধিকার কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশেষজ্ঞ করে তোলে না।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে মতামত প্রকাশ করলেই কেউ অর্থনীতিবিদ হয়ে যান না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে কয়েকটি পোস্ট পড়লেই কেউ ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক হয়ে ওঠেন না। চিকিৎসাবিষয়ক ভিডিও দেখাও কাউকে রোগ নির্ণয়ের যোগ্যতা দেয় না।
তবু অনলাইন আলোচনায় এসব পার্থক্য অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের কাছে গুরুত্ব হারায়।
আত্মবিশ্বাস যখন দক্ষতাকে ছাড়িয়ে যায়
জটিল বিষয় বুঝতে প্রমাণ, প্রেক্ষাপট এবং একাধিক ব্যাখ্যার বিবেচনা প্রয়োজন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহজ ভাষা, নিশ্চিত বক্তব্য এবং তীব্র আবেগ অনেক সময় বেশি দৃশ্যমান হয়।
একজন বিশেষজ্ঞ বলতে পারেন, একটি বিষয়ে একাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা রয়েছে। অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসী একজন মন্তব্যকারী সেটিকে এক বাক্যে ব্যাখ্যা করে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারেন। দ্বিতীয় বক্তব্যটি বোঝা, শেয়ার করা এবং বিতর্ক করা সহজ হওয়ায় দ্রুত বেশি প্রতিক্রিয়া পেতে পারে।
«“কম জ্ঞান, প্রবল আত্মবিশ্বাস, তাৎক্ষণিক বিচার।”»
এটি সরাসরি প্রমাণ করে না যে বাংলাদেশের মানুষ কম জ্ঞানী হয়ে যাচ্ছে। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাঠামো এমনভাবে কাজ করতে পারে, যেখানে নিশ্চিত বক্তব্য বেশি দৃশ্যমান হয় এবং সতর্কতা বা সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন ব্যবহারকারীরা নিজেদের পেশাগত বা একাডেমিক জ্ঞানের বাইরে গিয়ে মন্তব্য করেন। অর্থনৈতিক নীতিতে অপেশাদার মুদ্রানীতি বিশ্লেষণ, যুদ্ধ নিয়ে চূড়ান্ত সামরিক মূল্যায়ন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে খারিজ করার প্রবণতা এর উদাহরণ।
ফলে নিজের একটি মত থাকা এবং সেই মতের পক্ষে যথেষ্ট ভিত্তি থাকা—এই দুইয়ের পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হতে পারে।
মতের বিরোধ যখন ব্যক্তিগত আক্রমণে যায়
অনলাইন বিতর্কে সমস্যাটি আরও গভীর হয় যখন কোনো বক্তব্যের পরিবর্তে বক্তার পরিচয়কে আক্রমণের কেন্দ্র করা হয়। কোনো সাংবাদিকের যুক্তি রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্নে পরিণত হতে পারে, কোনো শিক্ষাবিদের ব্যাখ্যা তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় দিয়ে খারিজ হতে পারে, আর সামাজিক নীতি নিয়ে মতবিরোধ নৈতিক বিচারেও রূপ নিতে পারে।
বাংলা ভাষার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে গবেষণায় বিষাক্ত ভাষা, সাইবারবুলিং ও নৈতিক নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন প্রবণতা চিহ্নিত হয়েছে। এসব প্রবণতা দেখায়, অনলাইন মতবিরোধ অনেক সময় যুক্তি ও তথ্যের সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তিকে মূল্যায়নের দিকে চলে যায়।
বিশেষজ্ঞদের জন্য আরেকটি সমস্যা হলো জ্ঞান প্রকাশের গতি। পেশাগত জ্ঞান সাধারণত ধীর; এর জন্য গবেষণা, প্রমাণ ও যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্কৃতি চলে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার গতিতে।
«“উপলব্ধ প্রমাণ নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ দিচ্ছে না।”»
এর বিপরীতে ভাইরাল কোনো মন্তব্য হতে পারে, “সত্যটা সবাই জানে।” দ্বিতীয় বক্তব্যটি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুর্বল হলেও বক্তব্যের দৃঢ়তার কারণে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলো যেহেতু ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দেয়, ক্ষোভ, বিনোদন বা প্রবল সমর্থন তৈরি করা কনটেন্ট অনেক সময় সতর্ক ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে। জনপ্রিয়তা তখন কর্তৃত্বের একটি বিভ্রম তৈরি করতে পারে।
ডিজিটাল সাক্ষরতা থেকে জ্ঞানগত সচেতনতা
“আমি গবেষণা করেছি”-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত এই বাক্যটিও সমস্যাটিকে তুলে ধরে। নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায় এমন কয়েকটি পোস্ট পড়া গবেষণা নয়। গবেষণায় উৎস যাচাই, প্রমাণ বিশ্লেষণ, বিকল্প ব্যাখ্যা তুলনা এবং তথ্যের সীমাবদ্ধতা বোঝার প্রয়োজন হয়।
নির্বাচন, রাজনৈতিক সংকট, যুদ্ধ, জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক মানুষের তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।
আরও দায়িত্বশীল অনলাইন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ব্যবহারকারীদের কয়েকটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন:
আসলে কী দাবি করা হচ্ছে?
দাবিটির পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে?
প্রমাণটি কে তৈরি করেছে?
উৎসটির সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা আছে কি?
বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প ব্যাখ্যা রয়েছে কি?
আমি মতামত দিচ্ছি, নাকি তথ্যভিত্তিক দাবি করছি?
কোন প্রমাণ আমার অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে?
এসব প্রশ্নের জন্য সবাইকে একাডেমিক হতে হবে না। প্রয়োজন শুধু বোঝা যে আত্মবিশ্বাস কখনোই নিজে থেকে প্রমাণ নয়।
সমাধান অবশ্যই অপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান বা সাধারণ মানুষের বক্তব্য বন্ধ করা নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ অপরিহার্য, এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরের বাইরের মানুষের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পর্যবেক্ষণ তৈরি করতে পারে।
মূল পার্থক্যটি হওয়া উচিত কথা বলার অধিকার এবং বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতার মধ্যে। সবার মতামত থাকতে পারে, কিন্তু সব মতামতের প্রমাণগত ওজন সমান নয়।
বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার লাখ লাখ মানুষকে প্রকাশক, মন্তব্যকারী ও পর্যবেক্ষকে পরিণত করেছে। এখন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিগত নয়, সাংস্কৃতিক; কখন কথা বলতে হবে, কখন প্রশ্ন করতে হবে এবং কখন শুনতে হবে, সেই বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলা তৈরি করা।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
যখন সবকিছুই কনটেন্ট: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশিদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা
বিয়ে, সম্পর্ক, ভ্রমণ ও পারিবারিক মুহূর্তের অনলাইন প্রকাশ বদলে দিচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত জীবনের ধারণা।
বোয়েসেলের মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার নতুন সমঝোতার আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে, যা নিরাপদ ও স্বচ্ছ শ্রম অভিবাসনের নতুন…
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে আয় কমে ৮৬২ কোটি টাকায় নেমেছে
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত সরকারি তথ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ধারাবাহিক হ্রাসের চিত্র উঠে এসেছে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মানবিক সহায়তার প্রস্তাব বাংলাদেশের
প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ।



