মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

বিশ্ব

রাশিয়ার তীব্র বিমান হামলায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় ফ্রান্সের নতুন সহায়তা

রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা তীব্র হওয়ায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার ঘাটতি পূরণে ফ্রান্স দ্রুত সহায়তা বাড়াচ্ছে।

Jubayer Ahmed ·

বাড়ছে আকাশ প্রতিরক্ষার সংকট

ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আকাশপথে হামলা আরও তীব্র হচ্ছে। এর ফলে কিয়েভের ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নতুন করে সামনে এসেছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার বিশেষ করে উন্নতমানের ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিকে প্রকট করেছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টার আলোচনার পর ফরাসি সামরিক সরঞ্জাম ও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে যেসব মিত্র দেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মজুত আছে, তাদের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইউক্রেনের জন্য এসব ইন্টারসেপ্টর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রতিশ্রুতির সময়েই ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও অবকাঠামোয় রুশ হামলা অব্যাহত রয়েছে। সরবরাহ করা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ক্রিভি রিহ-তে একটি শপিং সেন্টারে রুশ ড্রোন হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত এবং ১৩০ জনের বেশি আহত হন। এরপর ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় আরও হামলা চালানো হয়। এতে আশঙ্কা বেড়েছে যে রাশিয়া তার আকাশ অভিযান আরও জোরদার করছে, যখন ইউক্রেনের উচ্চক্ষমতার ইন্টারসেপ্টর মজুত ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।

কিয়েভের তাৎক্ষণিক সমস্যা শুধু আকাশপথে হামলা শনাক্ত করা নয়; সেগুলো ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত বিশেষায়িত ইন্টারসেপ্টর নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

কেন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বড় চ্যালেঞ্জ

রাশিয়ার হামলায় বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহৃত হওয়ায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা ব্যবহার করা গেলেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অনেক বেশি গতিতে এগিয়ে আসে এবং এগুলো ঠেকাতে বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রয়োজন।

এই হুমকি মোকাবিলায় প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা হয়ে উঠেছে। কিন্তু কিয়েভ পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর সংগ্রহ করতে পারছে না। একই সময়ে মিত্র দেশগুলোর নিজেদের মজুতও চাপের মধ্যে রয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে কিয়েভের ওপর বড় ধরনের রুশ হামলায় এই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়। রাশিয়া বিপুলসংখ্যক ড্রোনের পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। ইউক্রেনীয় বাহিনী অনেক ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কঠিন। হামলায় আবাসিক ভবন, একটি শিশু হাসপাতালসহ বেসামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ফলে ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি এখন শুধু সামরিক সরবরাহের সমস্যা নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার ওপর, বিশেষ করে যখন রাশিয়া বড় আকারের ড্রোন হামলার সঙ্গে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও চালিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে ইউরোপের উদ্যোগ

ফ্রান্সের উদ্যোগ তাৎক্ষণিক ঘাটতি মোকাবিলার পাশাপাশি ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যও বহন করছে। প্যারিস ফ্রান্স-ইতালি যৌথভাবে তৈরি SAMP/T-NG ব্যবস্থাকে সমর্থন করছে। এটি একটি উন্নত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যাকে প্যাট্রিয়টের ইউরোপীয় বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে ইউক্রেন এই নতুন ব্যবস্থা পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে তার আগ পর্যন্ত ফ্রান্স অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনে দেশীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ দিতে লাইসেন্স অনুমোদনের বিষয়েও ম্যাক্রোঁ সমর্থন জানিয়েছেন।

জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ম্যাক্রোঁর সঙ্গে আলোচনায় ফরাসি সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ দ্রুত করার বিষয়টি উঠে এসেছে এবং লাইসেন্সের মাধ্যমে উৎপাদনে ফরাসি সমর্থনকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।

এই উদ্যোগ সীমিত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সরবরাহের ওপর ইউরোপের নির্ভরতা কমানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। ফ্রান্স ও ইতালি SAMP/T-NG এবং ভবিষ্যৎ ইন্টারসেপ্টরসহ এমন প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে, যা আরও জটিল ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলা করতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি ইউরোপীয় উৎপাদন ইউক্রেনের বর্তমান ঘাটতি তাৎক্ষণিকভাবে দূর করছে না। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অতিরিক্ত ইন্টারসেপ্টর ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কত দ্রুত ইউক্রেনে পৌঁছাতে পারে।

আকাশযুদ্ধের নতুন মাত্রা

সংঘাতের এই তীব্রতা শুধু রাশিয়ার হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউক্রেনও রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে একটি তেল শোধনাগার ও বড় গুদাম স্থাপনাও ছিল।

সরবরাহ করা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলার ঢেউয়ে রাশিয়া ও দখলকৃত এলাকায় অন্তত ১০ জন নিহত হন। অন্যদিকে মস্কো দাবি করেছে, তারা শত শত ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিহত করেছে।

ফলে যুদ্ধ ক্রমেই এমন এক পারস্পরিক আকাশযুদ্ধে পরিণত হচ্ছে, যেখানে উভয় পক্ষ দূরপাল্লার হামলার মাধ্যমে সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বহন করছে বেসামরিক জনগণ।

কিয়েভের জন্য অবশ্য প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতাই এখন সবচেয়ে জরুরি। জেলেনস্কি বারবার সতর্ক করেছেন যে ইন্টারসেপ্টর সরবরাহে বিলম্ব সরাসরি বেসামরিক প্রাণহানিতে রূপ নিতে পারে। সামনে আরেকটি শীতকাল থাকায় পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়ছে, কারণ ইউক্রেনের জ্বালানি ও অবকাঠামো ব্যবস্থা আবারও বড় ধরনের হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

ফ্রান্সের নতুন প্রতিশ্রুতি তাই কেবল আরেকটি অস্ত্র সহায়তার ঘোষণা নয়। এটি ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় তৈরি হওয়া একটি বিপজ্জনক ঘাটতি পূরণের চেষ্টা এবং একই সঙ্গে ইউরোপের আরও টেকসই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার পদক্ষেপ।

এখন মূল পরীক্ষা হলো অতিরিক্ত ইন্টারসেপ্টর কত দ্রুত ইউক্রেনে পৌঁছায়। রুশ হামলা অব্যাহত থাকা এবং উচ্চক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা অস্ত্রের সীমিত মজুতের মধ্যে মস্কোর বাড়তে থাকা আকাশ অস্ত্রভাণ্ডার এবং কিয়েভের প্রতিরোধ সক্ষমতার প্রতিযোগিতা যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট হয়ে উঠছে।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?