মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

বিশ্ব

যুদ্ধবিরতি আলোচনা থমকে থাকায় গাজায় মানবিক সংকট আরও গভীর

চলমান সহিংসতা, ত্রাণের ঘাটতি এবং নিরস্ত্রীকরণ ও সেনা প্রত্যাহার নিয়ে বিরোধ গাজার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে চাপে রেখেছে।

Jubayer Ahmed ·

চাপের মুখে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি

গাজার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আবারও চাপের মুখে পড়েছে। ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে, মানবিক পরিস্থিতি গুরুতর এবং বিস্তৃত রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে আলোচনাতেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

২৩ আগস্ট গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত দুজন ফিলিস্তিনি নিহত হন, যাদের মধ্যে চার বছর বয়সী এক শিশুও ছিল। আরও সাতজন আহত হন বলে রয়টার্সের উদ্ধৃত ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইসরায়েল বলেছে, গাজা থেকে আগুন লাগানো বেলুন, ড্রোন ও ঘুড়ি উড়ানোর পর এসব হামলা চালানো হয়েছে এবং তাদের সামরিক অভিযান আরও তীব্র হতে পারে।

সাম্প্রতিক সহিংসতা একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কাঠামো এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যকার ব্যবধানকে স্পষ্ট করেছে। রয়টার্সের উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ১,২৮০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি এবং চারজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

মিশর, কাতার ও তুরস্ক উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে এবং সতর্ক করেছে যে নতুন করে সামরিক অভিযান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

গাজার বেসামরিক মানুষের জন্য যুদ্ধবিরতি এখনো সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে পারেনি।

মূল বিরোধ এখনো অমীমাংসিত

কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি প্রস্তাব, যেখানে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার পুনর্গঠনের বিষয় রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক জ্যারেড কুশনার সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং হামাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আলোচনাকে গঠনমূলক বলা হলেও প্রস্তাবটির প্রতি ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোনো দৃঢ় অঙ্গীকার পাওয়া যায়নি।

আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে কোন পদক্ষেপ আগে হবে—এই প্রশ্ন।

ইসরায়েল দাবি করছে, সেনা প্রত্যাহারের আগে হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হতে হবে। অন্যদিকে হামাস যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার চায় এবং নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নকে বৃহত্তর ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করছে।

ফলে আলোচকদের দুটি মৌলিকভাবে ভিন্ন অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করতে হচ্ছে। বিরোধটি শুধু যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে নয়; গাজার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী হবে এবং অঞ্চলটি কীভাবে পরিচালনা ও পুনর্গঠন করা হবে—এসব প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

মিশর, কাতার ও তুরস্ক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় যুক্ত থাকলেও যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান এখনো মূল বাধাগুলো দূর করতে পারেনি।

মানবিক প্রয়োজন এখনো তীব্র

কূটনীতিকদের আলোচনা চললেও গাজার মানবিক সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী সংস্থা OCHA জানিয়েছে, প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধতা ও অর্থায়নের ঘাটতির মধ্যেও মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সংস্থাটির সর্বশেষ বিস্তারিত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মানবিক সহায়তা বাড়ার পর খাদ্যনিরাপত্তার পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সেই অগ্রগতি অত্যন্ত ভঙ্গুর।

জুলাইয়ের একটি মূল্যায়নে দেখা যায়, গাজার ৬৭ শতাংশ মানুষ উচ্চমাত্রার তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের চিকিৎসাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির দুর্বল পরিস্থিতি বিশেষ করে অতিরিক্ত ভিড়ের বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

ত্রাণ সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও প্রবেশাধিকার এখনো কঠোরভাবে সীমিত। জাতিসংঘ জানিয়েছে, মে মাসে জিকিম ক্রসিং বন্ধ হওয়ার পর কেরেম শালোম গাজায় একমাত্র কার্যকর সীমান্তপথ হিসেবে রয়েছে। ইসরায়েল যেসব পণ্যকে “দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে, সেগুলোর অনুমোদনে অতিরিক্ত জটিলতা থাকায় মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন সামগ্রী সরবরাহে বাধা তৈরি হচ্ছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের চলতি সপ্তাহের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী খুঁজতে আবর্জনার স্তূপে ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। একই সময়ে অনেক পরিবারের জন্য দাতব্য রান্নাঘর ও মানবিক সহায়তাও পর্যাপ্ত নয়।

নতুন করে ভেঙে পড়ার ঝুঁকি

যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি সামরিক তৎপরতা বন্ধ করতে পারেনি এবং প্রয়োজনীয় সেবার ওপর থাকা বিধিনিষেধও দূর হয়নি। ফলে মানবিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক।

জাতিসংঘের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সামরিক অভিযান ও হামলা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে ব্যাহত করছে, নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ঘটাচ্ছে এবং মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত করছে। অর্থায়নের ঘাটতি ও ত্রাণের পরিমাণ কমে গেলে খাদ্যনিরাপত্তায় সাম্প্রতিক উন্নতিও আবার হারিয়ে যেতে পারে।

একই সময়ে গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও অমীমাংসিত। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত প্রস্তাবে নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্গঠনের কথা থাকলেও হামাসের অস্ত্র এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সময় নিয়ে মতবিরোধ একটি চূড়ান্ত চুক্তির পথে বাধা হয়ে রয়েছে।

ফলে একটি ভঙ্গুর ব্যবস্থা টিকে আছে, যেখানে কূটনৈতিক আলোচনা চলার পাশাপাশি প্রাণঘাতী হামলাও ঘটছে এবং মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা তীব্র সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছে।

মধ্যস্থতাকারীদের সামনে এখন তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো যুদ্ধবিরতি আরও দুর্বল হয়ে পড়া ঠেকানো, মানবিক সহায়তার প্রবেশ বাড়ানো এবং সংঘাতের মূল রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।

গাজার সাধারণ মানুষের কাছে অবশ্য আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তির পার্থক্য এখনো স্পষ্ট। পরিবারগুলো বাস্তুচ্যুতি, প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি এবং নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

নিরস্ত্রীকরণ, সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধ যতক্ষণ না কমছে, ততক্ষণ স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা অনিশ্চিতই থাকবে—আর মানবিক সংকটের ভার গাজার মানুষের ওপর আরও দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

বিশ্ব

যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ ভঙ্গুর, গাজায় গভীরতর হচ্ছে মানবিক সংকট

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে নতুন সহিংসতা, ত্রাণ সংকট, বাস্তুচ্যুতি ও মৌলিক সেবার ঘাটতিতে গাজার মানবিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে।

৩ মিনিটের পড়া

রাজনীতি

মক্কা চুক্তিতে যোগদানের ভাবনা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বিতর্ক

মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা দেশটির দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

২ মিনিটের পড়া

মতামত

সিরিয়া সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা তালিকার বাইরে: একটি রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম, নাকি ভূরাজনীতির নতুন খেলা?

৪৭ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যা দেশটির জন্য নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।

৪ মিনিটের পড়া

বিশ্ব

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল থমকে, গভীর হচ্ছে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংকট

স্থবির কূটনীতি ও ট্যাংকারে হামলায় হরমুজে জাহাজ চলাচল কমেছে, চাপে তেলের বাজার এবং বাড়ছে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা।

২ মিনিটের পড়া