২০২৬–পরবর্তী গঙ্গা পানি চুক্তি: পানি, ক্ষমতার রাজনীতি ও বাংলাদেশের টিকে থাকার লড়াই
২০২৬ সালের পর গঙ্গার পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পরীক্ষা নেবে।

২০২৬ সালের পর গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ দক্ষিণ এশিয়ার সমকালীন ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল এবং কৌশলগতভাবে জটিল ইস্যুতে পরিণত হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে। এর মধ্য দিয়ে আন্তঃসীমান্ত পানি রাজনীতিতে সূচিত হতে যাচ্ছে এক নতুন ও সম্ভাব্য অস্থির অধ্যায়। এমন এক সময়ে এই পরিবর্তন আসছে, যখন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাস্তবতাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে।
ফারাক্কা ব্যারাজে শুষ্ক মৌসুমে পানি বণ্টনের ‘তুলনামূলক স্থিতিশীল’ কাঠামো হিসেবে যে চুক্তিকে একসময় দেখা হতো, তা এখন আর শুধু পানি ভাগাভাগির বিষয় নয়। এটি ক্রমেই রূপ নিচ্ছে পরিবেশগত স্থিতিশীলতা, কৃষির টিকে থাকা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে ঘিরে এক উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রশ্নে। জলবিজ্ঞান ও নীতিনির্ধারণী গবেষণায় অনুমান করা হয় যে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন মানুষ (৩-৪ কোটি মানুষ), বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, সুপেয় পানি, নৌপরিবহন এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গঙ্গা নদী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের জন্য গঙ্গার পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ কেবল নদীর পানিপ্রবাহ বণ্টনের কোনো কারিগরি বিষয় নয়। এটি সরাসরি জড়িয়ে আছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা, গ্রামীণ জীবিকা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার সঙ্গে। ২০২৬ পরবর্তী বাস্তবতায় বাংলাদেশ আদৌ একটি ন্যায্য ও জলবায়ু সংবেদনশীল পানি বণ্টন কাঠামো নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর। অন্যথায় বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে পানিসংকট ও পরিবেশগত চাপ আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
গঙ্গা চুক্তির মূল বিষয় হলো ফারাক্কা পয়েন্টে শুষ্ক মৌসুমের পানি বণ্টন। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য ভারত উজানে পানি মূল প্রবাহ থেকে সরিয়ে নেয়। ১৯৯৬ সালের চুক্তির লক্ষ্য ছিল জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সংকটকালীন সময়ে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ভারতের উজানের চাহিদাও পূরণ করা। প্রায় তিন দশক ধরে বিভিন্ন সময় উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও চুক্তিটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটাকে মন্দের ভালো বলা যায়। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা ১৯৯৬ সালের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গা অববাহিকার পানিপ্রবাহের ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, উজানে পানি প্রত্যাহার প্রকল্প, হিমবাহের পরিবর্তন, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নদীর প্রবাহ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে দুই দেশেই জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কৃষিতে পানির চাহিদা বাড়ায় মিঠাপানির ওপর চাপ ১৯৯৬ সালের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। যে ধারণার ভিত্তিতে ১৯৯৬ সালের চুক্তি হয়েছিল, অর্থাৎ নদীতে তুলনামূলক স্থিতিশীল পানিপ্রবাহ থাকবে, বর্তমান বাস্তবতা সেই ধারণাকে আর সমর্থন করে না।
বাংলাদেশের জন্য শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা সেচ, মৎস্যসম্পদ, সুপেয় পানি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য গঙ্গার পানির ওপর নির্ভরশীল। মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগর থেকে লবণাক্ত পানি মূলভূমির অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে, যা কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর নাব্যতা কমছে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে মিঠাপানির সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে।
এই পরিবেশগত পরিবর্তনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামীণ দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বাড়ছে, ফলে মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞেরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানিপ্রবাহ আরও কমে গেলে আগামী দশকগুলোতে জলবায়ুজনিত অভিবাসন ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে। সে অর্থে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সামগ্রিক জলবায়ু টিকে থাকার কৌশলের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তবে এই পুনরায় আলোচনার প্রক্রিয়া কোনো স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে হচ্ছে না। বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গত কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের পর শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার একটি রূপান্তরকাল অতিক্রম করে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ধরণে বড় প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ’ভারত বিরোধীতা’ এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারতকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনমুখী পররাষ্ট্রনীতি, ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয়দানের মত বিষয়গুলো বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশে সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে।
পূর্ববর্তী সরকারের (আওয়ামী লীগ শাসনামল) সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক অনেকাংশে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সমন্বয় ও তুলনামূলক স্থিতিশীল কূটনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু নতুন সরকার আরও দৃঢ় ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত দিয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা ইতিমধ্যে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, যাতে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থ ও ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।
এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়বে পানি কূটনীতিতে। আগে যেখানে অনেক ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে পানি আলোচনা এগিয়েছে, সেখানে ২০২৬ পরবর্তী পরিস্থিতি আরও প্রকাশ্য, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এবং স্বার্থনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পানি বণ্টনের প্রশ্ন বড় জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতের দিকেও রাজনৈতিক সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যাস্ত থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ফারাক্কা ব্যারাজের সঙ্গে রাজ্যটির সরাসরি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সমর্থিত সরকারের উত্থানের ফলে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে পানি নীতিতে সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা যায়। কারণ পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপ্যাধ্যায়কে বাংলাদেশের সাথে পানি চুক্তিতে বাঁধা মনে করা হত।
এর আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মতপার্থক্যের কারণে তিস্তা ইস্যুসহ বিভিন্ন আন্তসীমান্ত পানি আলোচনায় জটিলতা তৈরি হয়েছিল। নতুন রাজনৈতিক সমন্বয় ভারতের অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে পারে। তবে একই সঙ্গে পূর্ব ভারতে কৃষি, নগরায়ণ ও শিল্প সম্প্রসারণের কারণে বাড়তে থাকা পানির চাহিদা ভারতকে উজানের পানি সুরক্ষার প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
এতে বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। ভারত যেখানে উজানের পানির ব্যবহার নিয়ে আরও বেশি নমনীয়তা চায়, বাংলাদেশ সেখানে ভাটির পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা দাবি করছে। ফলে ২০২৬ পরবর্তী চুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারতের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাপ এবং বাংলাদেশের বাড়তে থাকা জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। পানি কূটনীতিকে আর কেবল নদীর পানিপ্রবাহের প্রশ্ন হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এটি এখন চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যকার বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠেছে।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই) উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন ও শিল্প বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যদিও গঙ্গা চুক্তি সরাসরি বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বিষয়, তবু দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এই আলোচনার কৌশলগত পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশও নদী পুনরুদ্ধার, পানি ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা চাইছে। এতে ভূরাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত না থাকলেও বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা কিছুটা বাড়ছে। অন্যদিকে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে কৌশলগত দৃষ্টিতে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে দেখছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্যাটেজির (আইপিএস) কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়াশিংটনের সম্পৃক্ততাও বেড়েছে। বৈশ্বিক উৎপাদন ও সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ায় দেশটির ভূরাজনৈতিক অবস্থানও নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখন এমন এক কৌশলগত বাস্তবতায় অবস্থান করছে, যেখানে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক একই সঙ্গে সামাল দিতে হচ্ছে।
এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা পানি কূটনীতিকেও প্রভাবিত করছে। গঙ্গা চুক্তি এখন আর শুধু নদীর পানি বণ্টনের বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক প্রভাব, সংযোগ, জলবায়ু সহনশীলতা ও কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণের বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
তবু দুই দেশই বুঝতে পারছে, চুক্তি পুরোপুরি অকার্যকর করে ফেলা উভয়ের জন্যই কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর হবে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যৌথ কারিগরি পর্যবেক্ষণ ও জলপ্রবাহ মূল্যায়নের কাজ শুরু হয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়। তবে বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করছেন, ১৯৯৬ সালের কাঠামো কেবল নবায়ন করলেই চলবে না।
কারণ সেই চুক্তি হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সময়ে। বর্তমান বাস্তবতা আরও অভিযোজনক্ষম, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং জলবায়ু সংবেদনশীল কাঠামো দাবি করছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শুষ্ক মৌসুমে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা। বর্তমান চুক্তির অন্যতম দুর্বলতা হলো, এতে পরিবেশগত ন্যূনতম সীমা কার্যকরভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ফলে কম প্রবাহের বছরগুলোতে বাংলাদেশ বারবার পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছে।
নতুন চুক্তিতে শুধু পানির পরিমাণ নয়, পরিবেশগত স্থিতিশীলতাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও মিঠাপানির পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে স্থিতিশীল পানিপ্রবাহ অপরিহার্য।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পানি বণ্টনের কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অতীতের নির্দিষ্ট কোটা বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর নয়। ভবিষ্যৎ চুক্তিতে বাস্তব সময়ভিত্তিক জলপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু পূর্বাভাস, মৌসুমি সমন্বয় এবং স্বচ্ছ তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বর্তমান চুক্তিটি প্রধানত ফারাক্কায় পানি বণ্টনের বিষয়টি সমাধান করে এবং যৌথ কমিটি ও যৌথ নদী কমিশনের মতো সীমিত যৌথ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এটি কোনো স্থায়ী অববাহিকা-ব্যাপী শাসন সংস্থা বা একটি সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করে না।তাই বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত গঙ্গা অববাহিকা ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী যৌথ কাঠামো গঠন। বর্তমান চুক্তি মূলত একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে পানি বণ্টনের ওপর কেন্দ্রীভূত। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনা। সমান প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে একটি যৌথ গঙ্গা অববাহিকা কমিশন গঠন করা গেলে তা চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, বিরোধ নিষ্পত্তি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের উচিত এই চুক্তিকে জলবায়ু ন্যায্যতার বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত করা। কারণ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই কম, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব আমাদের অসমভাবে বহন করতে হচ্ছে। মিঠাপানির সংকট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এগুলো বৈশ্বিক বৈষম্যেরও প্রতিফলন।
সবশেষে, ২০২৬ পরবর্তী গঙ্গা পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনা নয়। এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য একটি বড় পরীক্ষা, যেখানে প্রমাণ হবে জলবায়ু পরিবর্তন, রাজনৈতিক রূপান্তর ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এই যুগে আঞ্চলিক কূটনীতি কতটা অভিযোজিত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তি কেবল পানির প্রশ্ন নয়। এটি কৃষির স্থিতিশীলতা রক্ষা, পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকানো, জলবায়ু অভিবাসন কমানো এবং ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠা পরিবেশে জাতীয় সক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন।
সফলভাবে নতুন চুক্তি করা গেলে তা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য জলবায়ু সহনশীল আন্তসীমান্ত সহযোগিতার একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হলে বা দুর্বল চুক্তি হলে এর প্রভাব কূটনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে পানি নিরাপত্তাহীনতা, পরিবেশগত অবক্ষয় ও আঞ্চলিক অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে গঙ্গা উপমহাদেশের সভ্যতা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে যুক্ত করেছে। ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে মূল প্রশ্ন হলো, এই অভিন্ন নদী সহযোগিতার সেতু হিসেবেই থাকবে, নাকি তা ক্রমেই সংকট ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার বিভাজনরেখায় পরিণত হবে।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মানবিক সহায়তার প্রস্তাব বাংলাদেশের
প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ।
মক্কা চুক্তিতে যোগদানের ভাবনা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বিতর্ক
মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা দেশটির দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ইমরান খান ইস্যুতে আদালত-সংসদ সংঘাত, পাকিস্তানে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের আভাস
হাসপাতাল স্থানান্তর নিয়ে বিরোধ ও সামরিক নেতৃত্ব নিয়ে পিটিআইয়ের নরম সুর পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংঘাতকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী রহমান'র 'বাংলাদেশ ফার্স্ট'; ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের নতুন পরীক্ষা
তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে দিল্লির সঙ্গে আরও পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরির পরীক্ষায় ফেলতে পারে।




