মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

মতামত

নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান: পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা

নেপালের পাহাড়ি হড়পা বান বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি করায় কর্মক্ষেত্রে জরুরি নিরাপত্তা প্রোটোকল ও জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

Abdul Momen Talukder ·

বৃষ্টির পানির চেয়ে ভিন্ন: ডেব্রি-লেডেন বানের ধরন

নেপালের পার্বত্য অঞ্চলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যা সাধারণ বৃষ্টিজনিত বন্যা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। প্রযুক্তিগত পরিভাষায় এই ধ্বংসাত্মক বন্যাকে বলা হয় "ফ্ল্যাশ ফ্লাড" বা "ডেব্রি-লেডেন ফ্লাড"। এই দুর্যোগে শুধু বিপুল পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয় না, বরং সাথে নেমে আসে বরফ, বিশাল পাথর, কাদা, উপড়ে যাওয়া গাছ এবং ধ্বংসাবশেষের স্তূপ।

একজন পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা (ওএইচএস) বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাকে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি জটিল বহুমাত্রিক ঝুঁকি বা "মাল্টি-হ্যাজার্ড ইভেন্ট", যেখানে ঝুঁকি মূল্যায়ন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা প্রোটোকলের প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

দুর্যোগের প্রক্রিয়া এবং দ্রুতগতির বিপদ

পার্বত্য এলাকায় উঁচুতে জমে থাকা বরফ, পাথর ও মাটির স্তর আকস্মিকভাবে ধসে পড়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ রুদ্ধ করে দেয়। এই ধসে পড়া উপাদান নদীতে একটি অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করে। পানির স্তর দ্রুত বাড়তে থাকলে এই অস্থায়ী বাঁধের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয় এবং তা হঠাৎ ভেঙে যায়।

বাঁধ ভেঙে গেলে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পানি প্রচণ্ড গতিতে নিচের দিকে ধেয়ে আসে—সাথে বয়ে আনে পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এই দুর্যোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এর সময়সীমা। কিছু ক্ষেত্রে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। পেশাগত নিরাপত্তার ভাষায় এটি একটি জিরো-ওয়ার্নিং টাইম হ্যাজার্ড, যেখানে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় এতটাই কম থাকে যে প্রচলিত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে।

"জিরো-ওয়ার্নিং টাইম হ্যাজার্ডের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় এত কম থাকে যে প্রচলিত সরিয়ে নেওয়ার পদ্ধতিও অকার্যকর হয়ে পড়ে।"

অবকাঠামোগত ঝুঁকি ও সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী

সাধারণ বন্যায় মূলত পানি বৃদ্ধির কারণে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে হড়পা বানে পানির সাথে আসা বিশাল পাথর, বরফ ও উপড়ে পড়া গাছ মারাত্মক ভৌত আঘাত তৈরি করে। এই তীব্র প্রবাহ কয়েক মিনিটের মধ্যে সেতু, বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস করে ফেলে, যা একই সাথে ডুবে যাওয়া, আঘাতজনিত দুর্ঘটনা ও কাঠামোগত ধসের ঝুঁকি তৈরি করে।

নদী তীরবর্তী ও পাহাড়ি উপত্যকায় কর্মরত নির্দিষ্ট কিছু পেশাজীবী এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন:

  • অবকাঠামো নির্মাণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও ভারী যন্ত্রচালকরা

  • জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মকর্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী

  • নদীর কাছাকাছি থাকা কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ী

  • ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কর্মরত পর্যটন গাইড, পোর্টার ও রিসোর্ট কর্মী

ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ শ্রেণিবিন্যাস ও প্রস্তুতি

জলবায়ুজনিত এই ঝুঁকি মোকাবেলায় পেশাগত নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ শ্রেণিবিন্যাস (Hierarchy of Controls) প্রয়োগ করা আবশ্যক। ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পের প্রথাগত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণে জলবায়ু দুর্যোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

ঝুঁকি দূরীকরণ ও সঠিক স্থান নির্বাচন হলো প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। নদী তীরবর্তী ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বসতি বা কর্মস্থল স্থাপন বন্ধে সরকারি নীতি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। এরপর প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা এবং কর্মস্থলে কঠোর নিরাপত্তা নির্দেশিকা কার্যকর করতে হবে।

জরুরি প্রস্তুতি জোরদার করার মাধ্যমে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জরুরি সামগ্রী মজুত রাখা, নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া পরিচালনা করা এবং পরিবেশের প্রাথমিক লক্ষণ চিনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

জলবায়ু বাস্তবতায় নিরাপত্তা প্রোটোকলের পুনর্বিন্যাস

নেপালের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো দিন দিন আরও অপ্রত্যাশিত ও দ্রুতগামী হয়ে উঠছে। আধুনিক ওএইচএস কাঠামোকে এখন আর শুধু কর্মক্ষেত্রের প্রথাগত ঝুঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শ্রমিক, সমাজ ও অবকাঠামো রক্ষায় জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ঝুঁকিকে নিরাপত্তা নীতির মূল অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

রাজনীতি

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মানবিক সহায়তার প্রস্তাব বাংলাদেশের

প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ।

২ মিনিটের পড়া