হাওরে টিকে থাকার লড়াই: কমছে পানি-মাছ, তবুও হার মানছেন না কিশোরগঞ্জের কৃষক-জেলেরা
জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে কিশোরগঞ্জের হাওরে কৃষি ও জীবিকায় অভিযোজন বাড়লেও মৎস্য, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন ও পানি ব্যবস্থাপনায় বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।

কিশোরগঞ্জ, অষ্টগ্রাম। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সরাসরি লেগেছে মাছ ও ফসলে। কিন্তু একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, ঝুঁকি মোকাবিলায় নিজেদের মতো করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন এখানকার মানুষ কেউ ফসলের ধরন বদলে, কেউ চাষপদ্ধতি পাল্টে। অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও ইটনার স্থানীয় কৃষক, জেলে ও একজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এই টিকে থাকার লড়াইয়ের চিত্র যেখানে সাফল্যের পাশাপাশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বড় বড় ঘাটতিও।
এক ফসল থেকে দুই ফসলে
হাওরের সবচেয়ে বড় অভিযোজন হলো ফসল-বিন্যাসে পরিবর্তন। আগে যেখানে বছরে কেবল একটি ফসল (বোরো) হতো, বন্যা দেরিতে আসায় এখন অনেক জমিতে রোপা আমনের পরও বোরো চাষ সম্ভব হচ্ছে। মধ্য অষ্টগ্রামের এক কৃষক (৫১) বলেন, "পানি অহন আগের থেকে কম হয়, এজন্য ২ বার ই আবাদ করি।" উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এই দ্বৈত ফসলকে "এসেট" আখ্যা দিয়ে বলেন, প্রশিক্ষণ ও কৃষক-সংযোগের মাধ্যমে তারা সক্রিয়ভাবে এই রূপান্তরকে উৎসাহিত করছেন।
খরাপ্রবণ চৈত্র-বৈশাখে বিকল্প হিসেবে সরিষা চাষেও ঝুঁকছেন কৃষকরা। তিনি জানান, মাত্র ৮০ দিনে ঘরে তোলা যায় বলে সরিষাকে বোরোর আগের অনাবাদী সময়ে বসানো হচ্ছে, আর ভোজ্যতেল আমদানিনির্ভরতা কমাতে বীজ সহায়তাও দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। এর আগে ভুট্টাকেও একই উদ্দেশ্যে উৎসাহিত করা হয়েছিল, যদিও সার-নির্ভরতা ও ধানের আবাদে পরিবেশের বিরুপ প্রভাবের কারণে মন্ত্রণালয় পরে তা নিরুৎসাহিত করে একটি সিদ্ধান্ত, স্থানীয় পর্যায়ে যা নিয়ে দ্বিধা এখনও স্পষ্ট।
রোগ-প্রতিরোধী জাত, তবু ফলন-বিপর্যয়
ব্লাস্ট রোগ ("চিটা" বা "কারেন্ট পোকা") মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ ২৮, ২৯-এর মতো ঝুঁকিপূর্ণ জাত সরিয়ে ৮৮, ৮৯, ৯২, ৯৬, ১০০ নম্বর জাত সরবরাহ করছে বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই অভিযোজন এখনও পুরোপুরি ফল দিচ্ছে না। মিঠামইনের এক প্রান্তিক কৃষক ও মৌসুমি জেলে (৪৭) জানান, গত বছর ২৬ কাঠা জমিতে প্রত্যাশিত ২৫০-২৬০ মণের বদলে ধান পেয়েছেন মাত্র ৪০ মণ "ভিতরে চুচা, হুদা চুচা।"
নতুন জাতের মধ্যে ব্রি ৮৮, ৮৯, ৯২, ৯৬-এর পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে ১০১, ১০২ ও ১০৮ জাতও প্রবর্তনের চেষ্টা চলছে, আর বিনা-২৫ জাতে একরপ্রতি ৭০ মণেরও বেশি ফলন পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে এই বৈচিত্র্যই বলে দেয় হাওরের কৃষিতে অভিযোজনের চেষ্টা কতটা বহুমুখী। কীটনাশকনির্ভরতা কমাতে ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব সারের ব্যবহারও বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা। তার ভাষায়, "কৃষক এখন এটা বুঝতে পারছে এটা অনেক ভাল, খরচ কম, বিষও দেওয়া লাগে না" যদিও তিনি স্বীকার করেন, বেশিরভাগ কৃষক এখনও দ্রুত ফল পেতে রাসায়নিক কীটনাশকই বেশি পছন্দ করেন।
মৎস্য খাতে অভিযোজনের ঘাটতি
মাছের ক্ষেত্রে চিত্রটা সবচেয়ে দুর্বল। ইটনার এক প্রান্তিক জেলে (৩৮) জানান, এ বছর হাওরে পানি পেয়েছেন সর্বোচ্চ ৫ হাত, যেখানে দরকার ছিল ১০-১২ হাত ফলে আয় নেমে এসেছে আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে। প্রাকৃতিক পানিস্বল্পতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের তৈরি চাপ: নিষিদ্ধ চায়না জাল, রিং জাল ও কারেন্ট জাল দিয়ে অবাধে পোনা ও মা মাছ নিধন। মিঠামইনের ওই জেলে বলেন, "সবচেয়ে বড় ক্ষতি করতেছে চায়না জাল।" প্রশাসন সম্প্রতি প্রায় ১৭০টি চায়না জাল পুড়িয়ে দিলেও চোরাগোপ্তা ব্যবহার থামেনি বলে জানান ইটনার ওই জেলে।
ধ্বংসাত্মক মাছ ধরার পদ্ধতি এখানে আরও বিস্তৃত। প্রথাগত জালের পাশাপাশি ব্যাটারি-চালিত বৈদ্যুতিক শক (স্থানীয়ভাবে পরিচিত "কারেন্ট হিট") দিয়ে একসঙ্গে বড় পরিসরে মাছ মেরে ফেলার প্রবণতা বাড়ছে এই পদ্ধতিতে ছোট-বড় নির্বিশেষে সব মাছ ও জলজ প্রাণী মারা পড়ে, যা প্রজনন ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি আঘাত হানে। এর পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে গ্যাস ট্যাবলেট বা বিষ প্রয়োগ করে মাছ মারার অভিযোগও রয়েছে, যা মাছের পাশাপাশি পানির বাস্তুতন্ত্রের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। কৃষি কর্মকর্তা নিজেও স্বীকার করেন, ফসলের জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক শেষ পর্যন্ত পানির সঙ্গে মিশে মাছের ডিম ও পোনার ক্ষতি করে "যা মানুষের উপ্রে করে তা মাছের উপ্রেও করে," বলেন মিঠামইনের ওই জেলেও। অর্থাৎ কৃষি ও মৎস্য খাতের অভিযোজন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও তা এখনো সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে না।
এখানে প্রাতিষ্ঠানিক সাড়া তুলনামূলক দুর্বল মাছের প্রজনন মৌসুমে (মে-জুন) কড়া নজরদারি, নির্দিষ্ট ওজনের কম মাছ (যেমন ২ কেজির কম বাগাইড় বা ১ কেজির কম বোয়াল-আইড়) ধরা বন্ধে সচেতনতামূলক প্রচারণা, বিকল্প আয়ের সুযোগ বা মৎস্য অভয়াশ্রম সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ নিয়ে সাক্ষাৎকারদাতাদের কেউই আশাব্যঞ্জক কিছু বলতে পারেননি। ইটনার ওই জেলে সরাসরি বলেন, "আমরার এখানকার মাইনসের আর বিকল্প কিছু করার সুযোগ নাই।"
অবকাঠামো এগিয়েছে, ব্যবস্থাপনা পিছিয়ে
ভাতশালার এক প্রবীণ কৃষক (৮৫) মনে করেন বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণে হাওরবাসীর বন্যা-সহনশীলতা বাস্তবেই বেড়েছে "আগে বাতাস চালাইলে বাঁধে পানির ঢেউ ১০ ফুট উপরে উঠত, এখন ১ হাত ঢেউও হয় না।" তবে কৃষি কর্মকর্তার বিবরণে উঠে এসেছে এমন এক সমস্যা, যা অবকাঠামোরই বিপরীত ফল ব্যক্তি-উদ্যোগে অপরিকল্পিতভাবে নদী কাটার ফলে কলমা, আদমপুর ও আব্দুল্লাপুর এলাকায় পলি জমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে বোরো মৌসুমে জলাবদ্ধতায় ভুগছেন কৃষকরা। একই ধরনের মানবসৃষ্ট চাপ দেখা গেছে বড় পরিসরেও বরাক নদীর গতিপথ গাজিহাটির মতো এলাকা দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়ার ফলে কাস্তুল ইউনিয়ন ও দক্ষিণ অষ্টগ্রাম অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর নদী খননের পলি জমে কাস্তুল ইউনিয়নের অন্তত সাতটি গ্রামে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। "এই বৃহদাকারের সমস্যা মানুষ্যসৃষ্টি," বলেন কৃষি কর্মকর্তা, "স্থায়ী সমাধানের জন্য ড্রেজার দিয়ে কাটতে হবে, যা স্থানীয়ভাবে সম্ভব না।"
পানির উৎস নিয়েও একটা স্পষ্ট রূপান্তর ঘটছে। খরা মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে ৭০০ থেকে ১২০০ ফুট পর্যন্ত, আর সরকারও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করছে বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা এই প্রবণতার প্রেক্ষিতেই এখন জোর দেওয়া হচ্ছে সারফেস ওয়াটার বা নদী-হাওরের উপরিভাগের পানির ব্যবহারে, যার জন্য সৌরচালিত সেচ প্রকল্প চালু হয়েছে। তবে এই সৌর প্রকল্পের পরিধি এখনও সীমিত মাত্র ৫০০ মিটার এলাকা কাভার করছে দুটি প্রকল্প। এদিকে সরকারিভাবে বসানো গভীর নলকূপের সুবিধাও সবার জন্য সমান নয় নির্দিষ্ট ফি দিতে পারা পরিবারগুলোই কেবল এই সুবিধা পাচ্ছে, ফলে অধিকাংশ মানুষ এখনো নিরাপদ পানির উৎসের বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও সহনশীলতার সীমা
জলবায়ু-সহনশীলতার সবচেয়ে দুর্বল দিক স্বাস্থ্যখাত। কমবেশি প্রতিটি সাক্ষাৎকারেই এসেছে চর্মরোগ ও চুলকানির প্রকোপ বাড়ার কথা, বিশেষত বর্ষার নোংরা পানির সংস্পর্শে। এর বাইরে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া ও আমাশয়ের প্রকোপ বেশি, শীতকালে বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও ক্রনিক শ্বাসকষ্ট (সিওপিডি) সাধারণ ঘটনা, আর মাঝে মাঝে টাইফয়েড ও জন্ডিসের প্রাদুর্ভাবও দেখা যায় অর্থাৎ পানিবাহিত রোগের চাপ ব্যাপক। স্থানীয় হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় জটিল রোগে ভাগ্যক্রমে ভরসা ভৈরব বা কিশোরগঞ্জ শহর যেখানে চিকিৎসা খরচ একটি জেলে পরিবারের কয়েক সপ্তাহের আয়ের সমান হয়ে যায়। মধ্য অষ্টগ্রামের ওই কৃষক বলেন, দৈনিক ৪০০ টাকা আয়ে আটজনের পরিবার চালানো কঠিন, চিকিৎসা তো "লোন করে, ধার দেনা করে" চালাতে হয়।
স্যানিটেশন ব্যবস্থাও এই দুর্বলতাকে আরও গভীর করছে। বেশিরভাগ পরিবার পিট ল্যাট্রিন ব্যবহার করলেও আর্থিক সংকটে অনেকে খরচ কমাতে খোলা স্থানে মলত্যাগ করতে বাধ্য হন, বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে। হাত ধোয়া বা সাবানের ব্যবহারও সীমিত, আর সরকারিভাবে কোনো স্যানিটেশন প্রকল্প এখানে নেই। নারীদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনাও একটা উপেক্ষিত সংকট ব্যবহৃত প্যাড বা কাপড় সাধারণ গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গেই ফেলে দেওয়া হয়, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। এই পুরো খাতে কোনো সংগঠিত জলবায়ু-অভিযোজন কর্মসূচির উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। রান্নার জ্বালানিতে গোবরের চটা ও কাঠপাতাই এখনো প্রধান ভরসা, স্বচ্ছল পরিবারগুলো মাঝেমধ্যে এলপিজি ব্যবহার করলেও বিদ্যুতের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কায় তা এখনও ব্যাপক হয়ে ওঠেনি। বিদ্যুৎ সরবরাহও অনির্ভরযোগ্য গড়ে দিনে মাত্র ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান বাসিন্দারা, আর খরা মৌসুমে সরবরাহ আরও অপ্রতুল হয়ে পড়ে। বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রত্যাশায় আছেন বাসিন্দারা।
হাওরের মানুষের সহনশীলতার একটা বড় অংশ আসলে লুকিয়ে আছে তাদের প্রজন্ম-পরম্পরায় পাওয়া চিরাচরিত জ্ঞান আর জীবনাচরণে যা এখনো আধুনিক জলবায়ু-অভিযোজন কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে। হাওরবাসীর সময় ও প্রকৃতি মাপার একক এখনও বাংলা কৃষিপঞ্জিকা আর লোকজ পরিমাপেই বাঁধা পানি মাপা হয় "হাত" দিয়ে, জমি "কানি" আর ধান "মণে"। বৃষ্টি-বন্যা-মাছের ঋতু বোঝাতে জ্যৈষ্ঠ্য-আষাঢ়-ভাদ্র-কার্তিকের হিসাব আসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। রোকন উদ্দিনের মুখে উঠে আসে এমন এক লোকপ্রবাদ "ভাদ্দরমাইসা গরমে কুত্তা পানিত পরে" (ভাদ্র মাসের গরমে কুকুরও পানিতে পড়ে) প্রজন্মের পর প্রজন্ম আবহাওয়া বোঝার এই মৌখিক ঐতিহ্যই ছিল হাওরবাসীর প্রথম "পূর্বাভাস ব্যবস্থা।"
মাছ এখানে শুধু জীবিকা নয়, পরিচয়ের অংশ। রোকন উদ্দিন বলেন, "মাছ ছাড়া হাওড় কউন যায় না" মাছ ছাড়া হাওরকে হাওর বলাই যায় না। তার স্মৃতিতে এক সময় মাছের এত প্রাচুর্য ছিল যে "মাছের গন্ধে এহানে বই থাকতে পারতাইন না," আর মাছ কাটতে কাটতে হাতে ঘা হয়ে যেত। হুমায়ুন কবির গর্ব করে বলেন, ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামের মাছ "খুব সুসাদু" স্বাদে অনন্য। অন্যদিকে ইটনার মিষ্টি কুমড়া মাঠের পর মাঠ ফলিয়ে ময়মনসিংহ পর্যন্ত পাঠানোর কথা উল্লেখ করেন কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ সরকার এলাকাভিত্তিক এই কৃষি-পরিচয় স্থানীয় মানুষের কাছে গর্বের বিষয়।
তবে অভিযোজনের নামে বদলে যাওয়া কৃষিও কেড়ে নিচ্ছে কিছু সাংস্কৃতিক উপাদান। হুমায়ুন কবিরের আক্ষেপ, আগে "লাহাই, বোরো, কুফা"র মতো দেশি ধানের ভাত এত সুঘ্রাণ ছড়াত যে "একবাড়ি রানলে আরেকবাড়ি গ্রান শুনা গেছে" (এক বাড়িতে রান্না হলে পাশের বাড়িতেও ঘ্রাণ পাওয়া যেত)। আজকের উচ্চফলনশীল ২৮-২৯ জাতের ভাতে সেই তৃপ্তি নেই বলে তার আক্ষেপ সারের ব্যবহারও তুলনায় বেড়েছে বহুগুণ (একরে ১০ কেজি থেকে ২৫০-৩০০ কেজি)। একইভাবে হারিয়ে যাচ্ছে মহিষের গাড়ি বা গরুর গাড়িতে ধান আনার দৃশ্য, উঠানের মাটি কার্তিক মাসে বন্যার পলিতে ভরে ওঠার পুরনো স্মৃতি ("কার্তিমাইসা কাইতান"), আর কুয়ার পানি খাওয়ার অভ্যাস এসবই প্রজন্মান্তরে হারিয়ে যাওয়া জীবনযাত্রার অংশ, যেগুলো আর ফিরবে না।
সম্মিলিত সম্পদ ব্যবস্থাপনার লোকজ চর্চাও এখনও টিকে আছে, যদিও দুর্বল হয়ে। "গাং ডাকা" বা নদী ইজারা দেওয়ার প্রথায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা মৌসুমভিত্তিক টাকার বিনিময়ে জেলেদের মাছ ধরার অনুমতি দেন, আবার "জিয়ারত" নামের ঐতিহ্যবাহী কৃত্রিম অভয়াশ্রম ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট এলাকা বাউন্ডারি দিয়ে মাছ সংরক্ষণ করা হয় বলে জানান হুমায়ুন কবির। সেচ প্রকল্প পরিচালনার জন্য এলাকাবাসী নিজেরাই ভোটে বেছে নেন স্কিম ম্যানেজার রোকন উদ্দিনের ভাষায়, "ম্যানেজার আমরার বানান লাগে ইলেকশনে" এক ধরনের স্থানীয় গণতান্ত্রিক জল-ব্যবস্থাপনা, যা আনুষ্ঠানিক অভিযোজন-পরিকল্পনায় খুব একটা আমলে নেওয়া হয় না।
আবার ধর্মীয়-দার্শনিক এক নিয়তিবাদও হাওরের সহনশীলতা-সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। বন্যা বা খরার আগাম প্রস্তুতির প্রশ্নে রোকন উদ্দিনের সরাসরি জবাব "কুস্তা করিনা। মালিকের উপ্রে ছাইড়া দেই" (কিছুই করি না, সব সৃষ্টিকর্তার উপর ছেড়ে দিই)। এই মনোভাব একদিকে হাওরবাসীকে বারবার বিপর্যয়ের মুখেও মানসিকভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করে, অন্যদিকে সক্রিয় ঝুঁকি-প্রস্তুতিকে নিরুৎসাহিতও করতে পারে যা রেসিলিয়েন্স-পরিকল্পনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট।
কিশোরগঞ্জের হাওরবাসীর অভিজ্ঞতা তাই একই সঙ্গে অভিযোজন ও ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরে। কৃষকরা ফসল ও ধানের জাত বদলাচ্ছেন, মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্মের জ্ঞান ও সামাজিক বন্ধনের ওপর নির্ভর করছেন; কিন্তু মৎস্য, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এখনো তাদের মুখোমুখি হওয়া ঝুঁকির তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
তীব্র মৌসুমি বৃষ্টিতে এশিয়াজুড়ে বাড়ছে বন্যার ঝুঁকি
এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী মৌসুমি বৃষ্টিতে বন্যা, অবকাঠামো, কৃষি ও জনজীবনের ঝুঁকি বাড়ছে।
উত্তপ্ত দক্ষিণ এশিয়া: চরম তাপমাত্রাই হয়ে উঠছে নতুন স্বাভাবিকতা
দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র গরম আরও ঘন ঘন ও আগেভাগে আসছে, বাড়ছে স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অবকাঠামোর ঝুঁকি।
নেপালে বন্যা দুর্যোগ আরও ভয়াবহ পর্যায়ে, বাড়ছে আঞ্চলিক ঝুঁকি
নেপালে হিমালয়জুড়ে বন্যা দুর্যোগ আরও জটিল হয়ে উঠেছে; বাড়ছে প্রাণহানি, নিখোঁজের সংখ্যা ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি।
বোয়েসেলের মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার নতুন সমঝোতার আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে, যা নিরাপদ ও স্বচ্ছ শ্রম অভিবাসনের নতুন…



