মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

ধরিত্রী

উত্তপ্ত দক্ষিণ এশিয়া: চরম তাপমাত্রাই হয়ে উঠছে নতুন স্বাভাবিকতা

দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র গরম আরও ঘন ঘন ও আগেভাগে আসছে, বাড়ছে স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অবকাঠামোর ঝুঁকি।

TBB Newsroom ·

দক্ষিণ এশিয়া চরম তাপের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ তাপমাত্রা এখন আরও ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে, বছরের শুরুর দিকেই তাপপ্রবাহ শুরু হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য, জীবিকা ও জরুরি অবকাঠামোর ওপর বাড়ছে চাপ। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, যে তাপমাত্রা একসময় ব্যতিক্রমী বলে বিবেচিত হতো, বর্তমান জলবায়ুতে তা ক্রমেই স্বাভাবিক সম্ভাবনার অংশ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের মতো দেশগুলোতে ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ উচ্চ তাপমাত্রার মুখোমুখি হন। একই সঙ্গে অনেক মানুষ বাইরে কাজ করেন বা এমন ঘরে বসবাস করেন যেখানে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল কিংবা শীতল থাকার সুযোগ সীমিত।

চরম তাপের বদলে যাচ্ছে চিত্র

১৯৮১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রার চরম পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ২০২৬ সালের Journal of Climate-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের সাম্প্রতিক অনেক চরম তাপের ঘটনা বর্তমান জলবায়ুতে আর খুব বিরল নয়। বাংলাদেশে মে মাসে চরম তাপের ঝুঁকি বিস্তৃতভাবে বেড়েছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।

এতে বোঝা যায়, পরিবর্তনটি শুধু মাঝে মাঝে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার বিষয় নয়। বিপজ্জনক গরম তৈরি করার মতো পরিস্থিতিও ক্রমে বেশি দেখা দিচ্ছে।

২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানে বড় ধরনের প্রাক-বর্ষা তাপপ্রবাহ দেখা যায়। কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ওঠে। World Weather Attribution-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১৫ দিনের এই তাপপ্রবাহ প্রাক-শিল্প যুগের জলবায়ুর তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়েছে।

চরম তাপ ক্রমেই বিচ্ছিন্ন আবহাওয়া-জরুরি পরিস্থিতির বদলে নিয়মিত জলবায়ু ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।

বাংলাদেশে বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ২০২৬ সালের Journal of Climate গবেষণায় দেশের বড় অংশকে ভবিষ্যৎ চরম তাপের জন্য “sitting duck” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি বাড়ছে, অথচ ইতিমধ্যে দেখা সবচেয়ে তীব্র ঘটনাগুলো বর্তমান জলবায়ুর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ তাপের পুরো চিত্র নাও তুলে ধরতে পারে।

আর্দ্রতা এবং মানুষের বসবাস ও কাজের পরিবেশ এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। বাইরে কাজ করা মানুষ, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলযুক্ত ঘরে বসবাসকারী মানুষ এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ বা শীতল থাকার সুবিধা থেকে বঞ্চিত পরিবারগুলো বিশেষভাবে বিপদের মধ্যে রয়েছে।

World Bank-এর একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ তীব্র গরমের সংস্পর্শে আসতে পারেন। এত বড় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব পড়লে চরম তাপ আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা থাকবে না; এটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হবে।

স্বাস্থ্য ও জীবিকায় আঘাত

চরম তাপের প্রভাব জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির বহু ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় তাপে কাজ করাও ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

World Bank দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে চরম তাপকে উদীয়মান “jobs crisis” বা “কর্মসংস্থান সংকট” হিসেবে বর্ণনা করেছে। বাইরে কাজ করা মানুষের জন্য বিপজ্জনক দিনে কাজ বন্ধ রাখার অর্থ আয় হারানো; আবার কাজ চালিয়ে গেলে গুরুতর তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে।

অতিরিক্ত তাপ কৃষি উৎপাদন কমাতে পারে, পানির ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও পাখার ব্যবহার বাড়িয়ে দিতে পারে। তাপপ্রবাহের সময় বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এই বোঝা সবার ওপর সমানভাবে পড়বে না। দরিদ্র পরিবার, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, বয়স্ক মানুষ এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ বা শীতল থাকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বিপজ্জনক তাপ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলক কম।

উত্তপ্ত ভবিষ্যতের প্রস্তুতি

“নতুন স্বাভাবিকতা” বলতে এমন নয় যে প্রতিটি গ্রীষ্মেই নতুন রেকর্ড হবে। এর অর্থ হলো ঝুঁকির ভিত্তিই বদলে যাচ্ছে। যে তাপমাত্রা একসময় অস্বাভাবিক ছিল, তা ক্রমে বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠছে এবং ইতিহাসের ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলোও ঘন ঘন ঘটতে পারে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সরকারগুলোকে জরুরি প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি স্থায়ী প্রস্তুতি গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, তাপ-স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা, উন্নত নগর পরিকল্পনা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং শীতল থাকার সুবিধা বাড়ানো।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও অংশীদাররা ২০২৬ সালে জলবায়ু পূর্বাভাসকে স্বাস্থ্যগত পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যে নতুন আঞ্চলিক উদ্যোগ শুরু করেছে। এতে বোঝা যায়, তাপ থেকে সুরক্ষা এখন শুধু আবহাওয়া বা স্বাস্থ্য বিভাগের একক দায়িত্ব নয়; সরকার, নিয়োগকর্তা, নগর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত ভূমিকা দরকার।

বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে শুধু অভিযোজনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া চরম তাপ পুরোপুরি ঠেকাতে পারবে না। তবে ভালো প্রস্তুতি মৃত্যুঝুঁকি কমাতে, শ্রমিকদের সুরক্ষিত রাখতে এবং জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বাড়াতে পারে।

তাই মূল প্রশ্ন আর চরম তাপ ফিরে আসবে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—যে জলবায়ুতে বিপজ্জনক গরম নিয়মিত জীবনের অংশ হয়ে উঠছে, তার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার শহর, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্র ও অর্থনীতি কতটা প্রস্তুত।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

রাজনীতি

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মানবিক সহায়তার প্রস্তাব বাংলাদেশের

প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ।

২ মিনিটের পড়া

রাজনীতি

মক্কা চুক্তিতে যোগদানের ভাবনা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বিতর্ক

মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা দেশটির দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

২ মিনিটের পড়া