উচ্চ এলএনজি দামে বাংলাদেশের শিল্প প্রবৃদ্ধিতে ফের চাপ
ব্যয়বহুল আমদানি করা এলএনজি শিল্প, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সরকারি অর্থে চাপ বাড়াচ্ছে; বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজছে ঢাকা।

উচ্চ মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাংলাদেশের শিল্প প্রবৃদ্ধিতে নতুন করে চাপ তৈরি করছে। ব্যয়বহুল আমদানি করা গ্যাস উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সরকারি অর্থায়নে চাপ বাড়াচ্ছে বলে সতর্ক করেছে সরকার।
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, এলএনজির উচ্চ মূল্য শিল্প প্রবৃদ্ধিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন এবং স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনার প্রয়োজন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
গালফ অঞ্চল থেকে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের পর পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে। ইরান-সম্পর্কিত সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী কাতার এলএনজি রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ফলে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক ক্রয় সিদ্ধান্তেও মূল্যবৃদ্ধির মাত্রা স্পষ্ট। বাংলাদেশ প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (MMBtu) প্রায় ৩০ ডলার দরে এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে, যা বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের আগে পরিশোধ করা দামের প্রায় তিন গুণ।
শিল্প ও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ
বাংলাদেশের শিল্পখাতের জন্য এলএনজি সংকট নতুন নয়; এর সঙ্গে আগে থেকেই গ্যাসের প্রাপ্যতা ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ রয়েছে। রপ্তানিমুখী উৎপাদন, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রক্রিয়ায় গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এলএনজির উচ্চ দাম বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং ক্রয়মূল্যের তুলনায় কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করা হলে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপও বাড়ছে।
বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছেন, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির আগেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ দুই খাতে সম্মিলিত ব্যয় জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। এতে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতার আর্থিক চাপ স্পষ্ট হয়।
সংকটের সময় গ্যাস সরবরাহেও ওঠানামা হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিনে (mmcfd) পৌঁছায়। এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় এই মাত্রা সংকট-পূর্ব অবস্থার কাছাকাছি এসেছে।
তবে সরবরাহের এই উন্নতি তাৎক্ষণিক শিল্প সংকট কিছুটা কমালেও আন্তর্জাতিক এলএনজির দামের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা দূর করছে না।
অর্থনীতিতে বাড়ছে ব্যয়ের চাপ
এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একাধিক পথে প্রভাব ফেলতে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, বিশেষ করে যেসব কারখানা বয়লার, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ বা অন্যান্য শিল্পপ্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে গ্যাস ব্যবহার করে।
এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনের সময় কমানো, অতিরিক্ত ব্যয় নিজেরা বহন করা, পণ্যের দাম বাড়ানো অথবা নতুন বিনিয়োগ পিছিয়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার মধ্যে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে লাভের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
ভোক্তারাও এর প্রভাব পেতে পারেন। উচ্চ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যয় উৎপাদিত পণ্য ও বিভিন্ন সেবার দাম বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও বাড়ে, যা জ্বালানি আমদানি আরও ব্যয়বহুল হলে দেশের বৈদেশিক হিসাবের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
“সরকারের মতে, ব্যয়বহুল আমদানি করা এলএনজি উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সরকারি অর্থে প্রভাব ফেলছে।”
অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু একটি এলএনজি কার্গের ক্রয়মূল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানির দাম কারখানার প্রতিযোগিতা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বিকল্প সরবরাহের খোঁজে ঢাকা
তাৎক্ষণিক সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও চীনসহ বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কথাও ভাবছে সরকার। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে কর-সুবিধা দেওয়া। চীনের সঙ্গে ছোট আকারের মডুলার পারমাণবিক চুল্লি নিয়েও বাংলাদেশ আলোচনা করছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যান্য উৎস নিয়েও বিবেচনা চলছে।
তবে স্বল্পমেয়াদে এলএনজির গুরুত্ব কমছে না। গ্যাসের চাহিদা বাড়তে থাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ১ হাজার ৬০০ mmcfd এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এখানেই নীতিগত চ্যালেঞ্জটি স্পষ্ট। শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমদানি করা গ্যাসের ওপর বেশি নির্ভরতা আন্তর্জাতিক মূল্য, ভূরাজনৈতিক সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি বাড়ায়।
জ্বালানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন
বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের দ্রুত পরিবর্তন এবং দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ভূরাজনৈতিক ঘটনায় আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কতটা ঝুঁকি রয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানিয়েছে, উচ্চ দাম ও সরবরাহ বিঘ্নের কারণে এশিয়ায় ২০২৬ সালে এলএনজির চাহিদা টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কমতে পারে। গালফ অঞ্চল থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার পর এশিয়ার স্পট মার্কেটে দাম দ্রুত বেড়েছে। সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সালেও দাম তুলনামূলক উচ্চ থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের জন্য তাই আগামী কয়েক মাসের এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করাই একমাত্র প্রশ্ন নয়। শিল্প সম্প্রসারণের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির আর্থিক ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ের ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
স্বল্পমেয়াদে কারখানা ও মানুষের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার। দীর্ঘমেয়াদে বর্তমান মূল্যসংকট দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বহুমুখীকরণের ওপর আরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
দ্রুত শিল্প প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানির মূল্য ও নির্ভরযোগ্যতা উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকবে।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন
বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট: প্রবৃদ্ধি কি যথেষ্ট চাকরি তৈরি করছে?
তরুণ কর্মশক্তি বাড়লেও দক্ষতার ঘাটতি ও সীমিত কর্মসংস্থান শিক্ষা থেকে চাকরিতে প্রবেশের পথকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।
নতুন বেতন কাঠামো, মূল্যস্ফীতি ও কর সংস্কার: জীবনযাত্রার ব্যয় কি কমবে?
নতুন বেতন কাঠামো ও কর সংস্কার মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর চেষ্টা হলেও স্থায়ী স্বস্তি নির্ভর করবে মূল্য নিয়ন্ত্রণের ওপর।
গ্যাস সংকট বাড়তি এলএনজি নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে আনছে
এলএনজি টার্মিনালে বড় ধরনের বিঘ্ন বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালিতে চাপ তৈরি করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশে সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে করের বোঝা কমে ১ শতাংশ, মেয়াদ ১৮০ দিন
বাংলাদেশে যোগ্য সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে করের কার্যকর বোঝা প্রায় ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে ১৮০ দিনের জন্য।




