মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

অর্থনীতি

রেমিট্যান্সের রেকর্ডে স্বস্তি, তবে মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধিতে চাপ

রেকর্ড রেমিট্যান্স বৈদেশিক খাতকে শক্তিশালী করলেও মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সীমিত করছে।

Jubayer Ahmed ·

রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ, কিন্তু মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতি এখনো বড় চাপ হয়ে আছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭.৩ শতাংশ বেশি; একই সময়ে জুনে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল এবং জানুয়ারি–মার্চ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২.২২ শতাংশে।

এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়েছে: বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হলেও রেমিট্যান্সের এই সাফল্য এখনো ব্যাপক ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপ নেয়নি।

রেমিট্যান্সে বৈদেশিক খাতে বড় স্বস্তি

২০২৫–২৬ অর্থবছরের রেমিট্যান্স ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। রপ্তানি আয়ে দুর্বলতার মধ্যেও এটি বহিঃখাতকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরের ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স ১৭.৩ শতাংশ বেড়েছে।

নতুন অর্থবছরের শুরুতেও এই প্রবাহ শক্তিশালী ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রথম ২৯ দিনে দেশে ২.৭০৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮.৯ শতাংশ বেশি।

তবে বার্ষিক রেকর্ডের মধ্যেও প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। জুনে রেমিট্যান্স ছিল প্রায় ২.৮০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ০.৬ শতাংশ কম। এর আগে ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস মাসিক রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ছিল।

রেমিট্যান্স বহিঃখাতে স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু এটি অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল প্রবৃদ্ধির বিকল্প নয়।

প্রবৃদ্ধিতে পুনরুদ্ধার এখনো অসম

২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রাথমিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩.৪৯ শতাংশের চেয়ে বেশি। কৃষি ও সেবা খাত প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করলেও রপ্তানি কমে যাওয়া ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতায় শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ২.৮৬ শতাংশে নেমেছে।

তবে পরবর্তী ত্রৈমাসিকের তথ্য অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতা তুলে ধরেছে। জানুয়ারি–মার্চ সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.২২ শতাংশ হয়েছে; শিল্প উৎপাদন ০.২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে এবং কৃষি ও সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বাভাস ৬.১ শতাংশ। সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির গতি থেকে এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য গতি প্রয়োজন।

মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো প্রবল

জীবনযাত্রার ব্যয় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। জুনে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি মে মাসের ৯.৪২ শতাংশ থেকে কমে ৯.১৬ শতাংশে দাঁড়ালেও টানা তৃতীয় মাসের মতো তা ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৬০ শতাংশে নামলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৬১ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। জুলাই–ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য নীতিগত রেপো রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা কঠিন। উচ্চ ঋণের ব্যয় বেসরকারি বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে, যখন অর্থনীতিকে শিল্প, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক আস্থায় নতুন গতি দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

স্থিতিশীলতা থেকে টেকসই পুনরুদ্ধার

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশ এখনো রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতির বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। জুলাইয়ের মূল্যায়নে সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে, কার্যকর সংস্কার না হলে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে এবং মধ্যমেয়াদে তা ৩ শতাংশের নিচে চলে যেতে পারে।

আইএমএফ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস, কঠোর মুদ্রানীতি ও সতর্ক রাজস্বনীতি বজায় রাখা এবং ব্যাংকিং খাতের ব্যাপক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বৈদেশিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিনিময় হার ব্যবস্থার ধারাবাহিক বাস্তবায়নের কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশের সামনে তাই দ্বিমুখী পরীক্ষা। শক্তিশালী রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি, পারিবারিক ভোগ ও বহিঃখাতকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থের পাশাপাশি প্রয়োজন দেশীয় বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।

পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের সাফল্য নির্ভর করবে এই উন্নত বৈদেশিক অবস্থানকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, শক্তিশালী শিল্প, সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং নতুন কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা যায় কি না তার ওপর। রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে কিছুটা সময় ও স্বস্তি দিয়েছে; সেই স্বস্তিকে স্থায়ী পুনরুদ্ধারে পরিণত করাই এখন বড় পরীক্ষা।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

অর্থনীতি

বোয়েসেলের মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার নতুন সমঝোতার আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে, যা নিরাপদ ও স্বচ্ছ শ্রম অভিবাসনের নতুন…

২ মিনিটের পড়া