মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

অর্থনীতি

গ্যাস সংকট বাড়তি এলএনজি নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে আনছে

এলএনজি টার্মিনালে বড় ধরনের বিঘ্ন বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালিতে চাপ তৈরি করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।

TBB Newsroom ·

ঢাকা, ১৬ আগস্ট ২০২৬: এলএনজি টার্মিনালে সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাবে বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন ও গৃহস্থালিতে এর প্রভাব পড়ায় আমদানিনির্ভর এলএনজি ব্যবস্থার ওপর দেশের বাড়তে থাকা নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।

২১ জুলাই মহেশখালীর কাছে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার পর সংকটটি তীব্র হয়। এতে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হয়। সমস্যার আগে পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী দৈনিক সরবরাহ ছিল প্রায় ২,৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে চাহিদা ছিল প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

পরবর্তীতে টার্মিনালটির একটি ইউনিট আংশিকভাবে চালু হওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। আগস্টে রয়টার্স জানায়, একটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট চালু হয়ে দৈনিক প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ ফিরিয়েছে এবং মেরামত অব্যাহত ছিল।

গ্যাস সংকট থেকে বিদ্যুৎ চাপে

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দিলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জুলাইয়ের সংকটে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়ে যায়।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে লোডশেডিং বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি স্টেশনে সরবরাহ সংকট ও দীর্ঘ সারির কথা উঠে আসে।

গৃহস্থালিও সংকটের বাইরে থাকেনি। কম গ্যাসের চাপে অনেক পরিবার রান্না করতে সমস্যায় পড়ে, আর শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধার মুখে পড়ে। ফলে সমুদ্র উপকূলের একটি জ্বালানি অবকাঠামোর সমস্যা দ্রুত নগরজীবন ও অর্থনীতির সংকটে রূপ নেয়।

বাংলাদেশের জ্বালানি দুর্বলতা এখন শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব কারখানা, পরিবহন ও ঘরের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ সামলাতে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পদক্ষেপও অব্যাহত রেখেছে। এতে বোঝা যায়, সংকটের মূল কারণ কোনো দূরবর্তী অবকাঠামোয় থাকলেও তার অর্থনৈতিক প্রভাব বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি পৌঁছাতে পারে।

কেন এলএনজি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে

দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় বাংলাদেশে এলএনজির গুরুত্ব বেড়েছে। রয়টার্সের হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০–৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ প্রায় ২,৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি, ফলে একটি বড় কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে।

আমদানি করা এলএনজি এই ঘাটতি পূরণে সহায়তা করছে। তবে এর ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে। মূল্য, জাহাজ চলাচল, সরবরাহকারীর সক্ষমতা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ আমদানির খরচ ও নির্ভরযোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

সাম্প্রতিক সংকটের সময় আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারও ইরান-সম্পর্কিত সংঘাতের প্রভাবে চাপের মধ্যে ছিল। ফলে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত ত্রুটি এবং দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা আন্তর্জাতিক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়েছে।

সরকার অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির মাধ্যমেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। জুলাইয়ে ভিটল এশিয়ার কাছ থেকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ২২.৩৫ ডলার দরে একটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়; এর আনুমানিক ব্যয় ধরা হয় ৯৪৯.৪৩ কোটি টাকা।

জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কৌশলগত নিরাপত্তা

বর্তমান সংকটের প্রভাব বিদ্যুৎ সরবরাহের তাৎক্ষণিক প্রশ্নের চেয়ে অনেক বড়। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানির প্রাপ্যতা শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, খাদ্য প্রস্তুতি, বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

তাই জ্বালানি নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। দেশের বাইরে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের কোনো সরবরাহ সংকট আন্তর্জাতিক বাজারের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঘাত করতে পারে, আবার একটি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যাও একসঙ্গে বহু খাতে সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে।

তবে স্বল্পমেয়াদে এলএনজি বাদ দেওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন চাপের মধ্যে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি বন্ধ করলে সরবরাহ ঘাটতি আরও বড় হতে পারে।

কৌশলগত প্রশ্ন তাই এলএনজি ব্যবহার করা হবে কি না, তা নয়; বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার কতটা অংশ এলএনজির ওপর নির্ভর করবে, সেটিই মূল প্রশ্ন।

আরও স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থার প্রয়োজন

সাম্প্রতিক সংকট দেখিয়েছে, বাংলাদেশের প্রয়োজন কোনো একক সমাধান নয়; বরং জ্বালানি ব্যবস্থার বহুমুখীকরণ। দেশটির অগ্রাধিকার হতে পারে:

  • অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত করা;

  • এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ ও বিকল্প সক্ষমতা বাড়ানো;

  • নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ সক্ষমতা সম্প্রসারণ;

  • বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো উন্নত করা;

  • জ্বালানি দক্ষতা ও চাহিদা ব্যবস্থাপনা বাড়ানো; এবং

  • বড় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের জন্য জরুরি সরবরাহ পরিকল্পনা তৈরি করা।

মহেশখালীতে নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সরকার অনুমোদনও দিয়েছে। প্রস্তাবিত টার্মিনালের রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এর জন্য ১৫ বছরের টার্মিনাল-ব্যবহার চুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন সক্ষমতা সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে, তবে বৃহত্তর বহুমুখীকরণ না হলে আমদানিনির্ভরতাও বাড়াবে।

ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুরোপুরি চালু হলে তাৎক্ষণিক সংকট কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নটি থেকেই যাবে—বাংলাদেশ কি এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে একটি বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, নাকি একই আমদানিনির্ভর কাঠামোর ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হবে?

বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু আগামী দিনের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস নিশ্চিত করার বিষয় নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির প্রশ্ন, যেখানে একটি কারিগরি ত্রুটি, আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি বা ভূরাজনৈতিক সংকট পুরো অর্থনীতির কার্যক্রমকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে না পারে।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

অর্থনীতি

বোয়েসেলের মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার নতুন সমঝোতার আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে, যা নিরাপদ ও স্বচ্ছ শ্রম অভিবাসনের নতুন…

২ মিনিটের পড়া

রাজনীতি

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে আয় কমে ৮৬২ কোটি টাকায় নেমেছে

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত সরকারি তথ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ধারাবাহিক হ্রাসের চিত্র উঠে এসেছে।

২ মিনিটের পড়া

রাজনীতি

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মানবিক সহায়তার প্রস্তাব বাংলাদেশের

প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ।

২ মিনিটের পড়া

রাজনীতি

মক্কা চুক্তিতে যোগদানের ভাবনা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বিতর্ক

মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা দেশটির দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

২ মিনিটের পড়া