আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি: সরবরাহ হ্রাস ও গভীর অনিশ্চয়তার মুখে জ্বালানি খাত
পিডিবির চিঠির জবাব না দিয়ে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ৯১৫ মেগাওয়াটে নেমে আসায় চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও তদন্তের দাবি উঠেছে।

জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সম্পাদিত একটি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পরপর তিনবার চিঠি পাঠানো সত্ত্বেও আদানি পাওয়ার কোনো সন্তোষজনক জবাব দেয়নি। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা কেন্দ্র থেকে পূর্বে ১,৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও সম্প্রতি তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯১৫ মেগাওয়াটে। জাতীয় বিদ্যুৎ সংকটের এই চরম মুহূর্তে সরবরাহের এই বিশাল ঘাটতি চুক্তিভিত্তিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল।
চুক্তির অসম শর্ত ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি
চুক্তি স্বাক্ষরের সূচনালগ্ন থেকেই খাতের বিশেষজ্ঞরা এর বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন। অস্বাভাবিক ক্যাপাসিটি চার্জ, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ এবং একক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরির মতো শর্তগুলো শুরু থেকেই দেশের স্বার্থের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। বর্তমানের এই সরবরাহ সংকট মূলত সেই অপরিকল্পিত কাঠামোগত দুর্বলতারই সরাসরি বহিঃপ্রকাশ।
একটি একক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা অর্পণ করা ব্যবসায়িক দুর্বলতার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার দাবি
প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার দায় আদানি পাওয়ারের ওপর বর্তালেও, তৎকালীন নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। চুক্তির প্রস্তাবনা, আলোচনা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের সাথে সম্পৃক্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা বিস্তারিত পর্যালোচনার দাবি রাখে। দেশীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে এই ধরনের শর্ত মেনে নেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের চিহ্নিত করার কোনো কার্যকর দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এই ধরনের নিষ্ক্রিয়তা প্রশাসনিক জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে তোলে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের চুক্তি সংক্রান্ত জটিলতা তৈরির পথ সুগম করে।
নীতিগত সংস্কার ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
উদ্ভুত সংকট মোকাবেলা এবং ভবিষ্যত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:
চুক্তির প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রক্রিয়াবলি তদন্তে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করা।
চুক্তিগত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আদানির বিরুদ্ধে আইনি ও কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অবস্থান গ্রহণ করা।
একক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা দ্রুত হ্রাস করে সার্বিক জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনা।
যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি চূড়ান্ত করার পূর্বে স্বাধীন তদারকি সংস্থার পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করা।
বিদ্যুৎ খাতের স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত: পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণে ঐতিহাসিক চুক্তি
পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে আইডিবি-র সাথে ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ।
গ্যাস সংকট বাড়তি এলএনজি নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে আনছে
এলএনজি টার্মিনালে বড় ধরনের বিঘ্ন বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালিতে চাপ তৈরি করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।
হরমুজ নিয়ে ইরানের শর্ত বহাল, আঞ্চলিক ঝুঁকিতে বাড়ল তেলের দাম
হরমুজ খুলে দেওয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়ের শর্ত জুড়ে দেওয়া এবং নতুন হামলায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে।



