বেলুচিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ ও আধুনিক অস্ত্রের রহস্যময় উৎস
অর্থনৈতিক বঞ্চনা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং আধুনিক সমরসজ্জার যোগসূত্রে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে বিচ্ছিনতাবাদ ও সংঘাত নতুন মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে।

ঐতিহাসিক ক্ষোভ এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রেক্ষাপট
বেলুচিস্তানের সংঘাতের শিকড় কয়েক দশকের গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার সাথে যুক্ত। ১৯৪৮ সালে কালাত রাজ্য পাকিস্তানের অংশ হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলে একাধিকবার বিদ্রোহ হয়েছে, যার বর্তমান পর্বটি ২০১৯ সালের পর আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকা জুড়ে অবস্থিত এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তামা ও সোনার বিপুল মজুত রয়েছে।
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য সত্ত্বেও পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এটি দেশের সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ। এখানকার মাথাপিছু আয় এবং মানব উন্নয়ন সূচক জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক নিচে, এবং জাতীয় জিডিপিতে প্রদেশটির অবদান অত্যন্ত সীমিত। সম্পদের বিপুল প্রাচুর্য বনাম সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যের এই চরম বৈপরীত্যই স্থানীয় আন্দোলনের মূল ভিত্তি।
সিপিইসি প্রকল্প ও স্থানীয়দের বঞ্চনার বাস্তবচিত্র
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) গড়ে উঠেছে গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে, যা চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলকে সমুদ্রের সাথে যুক্ত করে। বিশাল এই প্রকল্পকে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার বলা হলেও স্থানীয় বেলুচ জনগণের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। প্রাদেশিক পরিষদে উপস্থাপিত নথি অনুসারে, বন্দর পরিচালনাকারী চীনা প্রতিষ্ঠান অর্জিত রাজস্বের ৮৫ শতাংশ নিজের কাছে রাখে এবং ১৫ শতাংশ পায় গোয়াদর বন্দর কর্তৃপক্ষ, যার থেকে প্রাদেশিক সরকার কোনো অংশই পায় না।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয় যে সিপিইসি প্রধানত সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি করেছে, তবে স্থানীয়দের জন্য খুব কম সুবিধাই নিশ্চিত করতে পেরেছে।
সমুদ্রে অবাধ প্রবেশাধিকার হারিয়ে জীবিকা সংকটে পড়েছেন গোয়াদরের ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবীরা, যা জন্ম দিয়েছে "গোয়াদর কো হক দো" আন্দোলনের। এছাড়া সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা বহিরাগতদের হাতে চলে যাওয়ায় অসন্তোষ আরও গভীর হচ্ছে।
আধুনিক সমরসজ্জা ও অস্ত্রের বহুমুখী উৎস
নিহত বিএলএ সন্ত্রাসী রিয়াজ নাচারির কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া সমরসজ্জার মূল্য প্রায় ৩৬ লক্ষ পাকিস্তানি রুপি, যার মধ্যে ৬,৯৯০ ডলারের রাইফেল, ৩,১০০ ডলারের অপটিক ও ২,৮৫০ ডলারের স্যাটেলাইট যোগাযোগ যন্ত্র রয়েছে। সংগঠনটির "মজিদ ব্রিগেড" আত্মঘাতী হামলা এবং "ফাতেহ স্কোয়াড" শহুরে জটিল অভিযানে বিশেষ পারদর্শী হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে এত ব্যয়বহুল ও আধুনিক অস্ত্রের মূলত তিনটি সম্ভাব্য উৎস রয়েছে:
২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পর রেখে যাওয়া অস্ত্রভাণ্ডার যা অবৈধ বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভারতের আর্থিক ও সামরিক সহায়তার অভিযোগ, যা পাকিস্তান দাবি করলেও ভারত অস্বীকার করে আসছে এবং নিরপেক্ষ সূত্রে প্রমাণিত নয়।
আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ইরান সীমান্ত এলাকার সক্রিয় অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান নেটওয়ার্ক।
সামরিক অভিযান ও টেকসই সমাধানের চ্যালেঞ্জ
পাকিস্তানি বাহিনী অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে গোয়েন্দা ভিত্তিক সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গত জানুয়ারিতে পাঞ্জগুর ও হারনাইয়ে অভিযানে ৪১ জন বিএলএ ও টিটিপি সদস্য নিহত হয়। পরবর্তীতে জুন মাসের অভিযানেও পাঁচটি আইইডি এবং ছয়টি রকেট লঞ্চার শেল সহ বিপুল গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।
যদিও এসব অভিযান স্বল্পমেয়াদে তাদের শক্তি হ্রাস করে, তবুও কেবল সামরিক পদক্ষেপ দিয়ে মূল অসন্তোষ দূর করা সম্ভব নয়। সরকারি পক্ষ একে কেবল বহিরাগত সন্ত্রাসবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, অন্যান্য বিশ্লেষকদের মতে টেকসই সমাধানের জন্য অর্থনৈতিক ন্যায্য বণ্টন, রাজনৈতিক অধিকার এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
শক্তিশালী সুপার এল নিনো নিয়ে বিজ্ঞানীদের সতর্কতা, বাড়তে পারে জলবায়ুর প্রভাব
শক্তিশালী এল নিনো ও ইতিবাচক ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল দক্ষিণ এশিয়ায় তাপ, বৃষ্টিপাত ও কৃষিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মানবিক সহায়তার প্রস্তাব বাংলাদেশের
প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ।
মক্কা চুক্তিতে যোগদানের ভাবনা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বিতর্ক
মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা দেশটির দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ইমরান খান ইস্যুতে আদালত-সংসদ সংঘাত, পাকিস্তানে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের আভাস
হাসপাতাল স্থানান্তর নিয়ে বিরোধ ও সামরিক নেতৃত্ব নিয়ে পিটিআইয়ের নরম সুর পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংঘাতকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।




