মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

মতামত

ব্যাটারিচালিত রিকশার বহুমাত্রিক সংকট: নীতিনির্ধারকদের সামনে জটিল সমীকরণ

ব্যাটারিচালিত রিকশার দ্রুত বিস্তার বিদ্যুৎ, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর পারস্পরিকভাবে যুক্ত চাপ তৈরি করছে।

Abdul Momen Talukder ·

বাংলাদেশের সড়কে এখন যে বাহনটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা বাস নয়, প্রাইভেট কার নয় ব্যাটারিচালিত রিকশা বা তথাকথিত "তিন চাকার টেসলা"। বিআরটিএ ও বিভিন্ন সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী দেশজুড়ে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইক চলাচল করছে, যার মধ্যে শুধু ঢাকাতেই আছে প্রায় ১০-১২ লক্ষ। গত তিন বছর বিশেষত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তদারকি শিথিল হওয়ার সুযোগে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে এবং অলিগলি ছাড়িয়ে এখন মূল সড়কেও এগুলো প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে।

এই বিস্তারকে আর শুধু যানবাহন-সমস্যা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এটি একই সঙ্গে জাতীয় বিদ্যুৎ কাঠামো, পরিবেশ, চালকদের স্বাস্থ্য, সড়ক নিরাপত্তা এবং লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল নীতিগত সংকট।

বিদ্যুৎ কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ

এই বিপুল বহরের বিদ্যুৎ চাহিদাও উল্লেখযোগ্য। একটি রিকশা দৈনিক গড়ে ৬-৯ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করে ধরলে, সারাদেশে দৈনিক চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৭৫০-৮০০ মেগাওয়াটে। মাসিক হিসাবে তা প্রায় ৭২ কোটি ইউনিট বা ৭২০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা, যার বাজারমূল্য মাসে প্রায় ৭৫০-৯০০ কোটি টাকা।

চার্জিংয়ের সিংহভাগ হয় রাতে এবং অনেক ক্ষেত্রেই অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে। আলাদা ট্যারিফ কাঠামো, নির্ধারিত চার্জিং স্টেশন ও পরিকল্পিত লোড-ব্যবস্থাপনা না থাকায় এই অতিরিক্ত চাহিদাকে জাতীয় বিদ্যুৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

«অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থা বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর থাকা চাপকে আরও জটিল করে তুলছে।»

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও দাবদাহ ও ভরা মৌসুমে বাস্তব সরবরাহ প্রায়ই চাহিদার নিচে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকের চাহিদার সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। মিটারবহির্ভূত সংযোগ বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ও রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ায়।

লেড ব্যাটারি ও পরিবেশগত ঝুঁকি

প্রতিটি রিকশায় সাধারণত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়, যার আয়ুষ্কাল প্রায় এক থেকে দেড় বছর। লাখ লাখ রিকশার কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাতিল ব্যাটারি তৈরি হচ্ছে, যার বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক ও অনিয়ন্ত্রিত পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থায় যাচ্ছে।

খোলা জায়গায় ব্যাটারি গলানোর ফলে সীসা মাটি, পানি ও বাতাসে মিশতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তরও এই ক্রমবর্ধমান সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানিয়েছে। এর বাইরে যন্ত্রাংশ, টায়ার ও অন্যান্য বর্জ্যও ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা ও সুপেয় পানির মানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বহরের দ্রুত সম্প্রসারণ এই সমস্যাকে আরও বাড়ায়। রিকশার সংখ্যা বাড়লে ব্যাটারি প্রতিস্থাপনের হারও বাড়ে, আর কার্যকর সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা না থাকলে ক্ষতিকর উপাদান লোকালয়ের মধ্যেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

চালকের স্বাস্থ্য ও সড়ক নিরাপত্তা

এই সংকটের নীরব শিকার চালকেরাও। দীর্ঘ সময় কুঁজো হয়ে বসে এবং ঝাঁকুনিপূর্ণ রাস্তায় গাড়ি চালানোর কারণে মেরুদণ্ড ও কোমরের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

ব্যাটারি রক্ষণাবেক্ষণ বা অনিরাপদ মেরামতের সময় সীসার সংস্পর্শ স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমের আশপাশে থাকা শিশুরাও সীসা দূষণের ঝুঁকিতে থাকে, যা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে ক্ষতি করতে পারে।

সড়ক নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সবিহীন বিপুলসংখ্যক চালকের উপস্থিতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং এই খাতের সামগ্রিক সামাজিক ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এই সমস্যাগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বিদ্যুৎ সংকট অনানুষ্ঠানিক চার্জিংকে উৎসাহিত করতে পারে, অনিয়ন্ত্রিত বহর ব্যাটারি ব্যবহারের হার ও বর্জ্য বাড়ায়, আর পরিবেশ দূষণ ও অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ চালকদের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব জাতীয় স্বাস্থ্যব্যয় ও শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতার ওপরও পড়তে পারে।

জীবিকা ও ঝুঁকির মধ্যে নীতিগত ভারসাম্য

সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এই খাত নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধন ব্যবস্থা, সমন্বিত নীতিমালা এবং নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচল সীমিত করার উদ্যোগের আলোচনা চলছে। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা বা বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত সমাধান নয়, কারণ লাখো মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত।

একটি সমন্বিত নীতিকাঠামোতে থাকতে পারে:

  • পিক আওয়ারে গ্রিডের চাপ কমাতে নির্ধারিত চার্জিং সময় ও পৃথক ট্যারিফ।

  • লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে ধাপে ধাপে লিথিয়াম-আয়ন বা নিরাপদ প্রযুক্তিতে রূপান্তর।

  • বাতিল ব্যাটারি সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা।

  • চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স এবং ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি।

  • বাহনের নকশা ও গতিসীমার জন্য প্রযুক্তিগত মানদণ্ড।

ব্যাটারিচালিত তিন চাকার এই বাহন বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এটি সস্তা, সহজলভ্য এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস; কিন্তু গত তিন বছরের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার দেখিয়েছে, তদারকিহীন প্রবৃদ্ধি কীভাবে একটি কার্যকর পরিবহন সমাধানকে নতুন জাতীয় সংকটে পরিণত করতে পারে।

তাই নীতিগত প্রশ্নটি শুধু এই বাহন সড়কে থাকবে কি না, তা নয়। বরং কীভাবে এর পরিবহন ও কর্মসংস্থানের সুবিধা বজায় রেখে খাতটিকে আনুষ্ঠানিক, নিরাপদ, পরিবেশসম্মত ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা যায়—সেটিই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

ধরিত্রী

উত্তপ্ত দক্ষিণ এশিয়া: চরম তাপমাত্রাই হয়ে উঠছে নতুন স্বাভাবিকতা

দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র গরম আরও ঘন ঘন ও আগেভাগে আসছে, বাড়ছে স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অবকাঠামোর ঝুঁকি।

৩ মিনিটের পড়া