মূল অংশে যান

Truth Beyond Boundaries

ধরিত্রী

ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট: একটি নগরীর নীরব বিপর্যয়

দ্রুত নগরায়ন ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঢাকার সড়ক, ড্রেন ও নদীগুলোতে বাড়ছে বর্জ্যের চাপ।

Md. Abu Sayem ·

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ক্রমেই গভীর সংকটে পড়ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র এবং দুই কোটিরও বেশি মানুষের এই রাজধানীতে প্রতিদিন আনুমানিক ৬,৫০০ থেকে ৭,৫০০ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। ২০৩২ সালের মধ্যে দৈনিক বর্জ্যের পরিমাণ ৮,৫০০ টনে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাড়ছে বর্জ্যের চাপ

ঢাকার বর্জ্য সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো সংগ্রহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। পুরনো জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ সালে ঢাকায় মাত্র প্রায় ৩৭ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অননুমোদিত স্থানে, ড্রেনে ও খোলা জায়গায় জমা হয়েছে অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।

সারাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২৫,০০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয় বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে শহরাঞ্চলের প্রায় ৫৫ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহের আওতার বাইরে থাকে। ঢাকায় মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে—২০১৭-১৮ সালে দৈনিক ০.৫৭৫ কেজি থেকে ২০১৯-২০ সালে তা বেড়ে ০.৭২ কেজিতে দাঁড়ায়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলে ১১৮টি অস্থায়ী সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন পরিচালনা করে। এসব স্টেশন থেকে বর্জ্য আমিনবাজার, মাতুয়াইল, বেড়িবাঁধ ও উত্তরাসহ বিভিন্ন প্রধান নিষ্পত্তিস্থলে পাঠানো হয়।

বিভিন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৪,৫০০ টন কঠিন বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকায় বছরে প্রায় ৪,৮২০ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার পুরোটা ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।

কেন সংকট বাড়ছে

দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। নতুন আবাসিক এলাকা, বাজার ও শিল্প প্রতিষ্ঠান দ্রুত গড়ে উঠলেও বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা সেই অনুপাতে সম্প্রসারিত হয়নি।

উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণও এখনো সীমিত। অধিকাংশ বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা করে ফেলার অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। এতে পুনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিং ও কম্পোস্টিং কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়ে।

প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতাও বড় সমস্যা। সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার বিভিন্ন দায়িত্ব থাকলেও সমন্বয়ের ঘাটতি বাস্তবায়নকে দুর্বল করে। ২০১০ সালের জাতীয় ৩আর কৌশলের মতো নীতিমালা থাকলেও এর বাস্তবায়ন ও তদারকি পর্যাপ্ত নয়।

শহরের চাহিদার তুলনায় বর্জ্য সংগ্রহের যানবাহন, কর্মী ও স্থানান্তরকেন্দ্রও অপর্যাপ্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাগরিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের একাংশের দায়িত্বহীনভাবে রাস্তাঘাট, ড্রেন ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা।

শিল্প ও চিকিৎসা বর্জ্যও পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করছে। পর্যাপ্ত শোধন ছাড়া এসব বর্জ্য নদী বা পরিবেশে গেলে রাসায়নিক ও জীবাণু দূষণ বাড়ে।

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে ক্ষতি

এই সংকটের প্রভাব শুধু অপরিচ্ছন্ন রাস্তা বা উপচে পড়া ডাস্টবিনে সীমাবদ্ধ নেই। বুড়িগঙ্গা দীর্ঘদিনের দূষণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার মতো নদীগুলোও অপরিশোধিত বর্জ্য ও বর্জ্যপানির চাপে একই ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো ঢাকার বায়ুদূষণকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। দূষিত নদী ও জলাশয় জলজ প্রাণবৈচিত্র্য নষ্ট করার পাশাপাশি নদীনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও ক্রমেই বাড়ছে। নদীতীরবর্তী প্রায় ৪০ লাখ মানুষ দূষিত পানি ও সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ঝুঁকির সংস্পর্শে থাকেন। ভারী ধাতুর সংস্পর্শ কিডনি জটিলতা, স্নায়বিক সমস্যা এবং কিছু ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দূষিত পরিবেশে পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাও বাড়তে পারে।

উপচে পড়া ডাস্টবিন ও অপরিকল্পিত ট্রান্সফার স্টেশন ফুটপাত ও সড়কের জায়গা দখল করে যানজট বাড়ায় এবং পথচারীদের চলাচল কঠিন করে। দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ঢাকার সামগ্রিক বাসযোগ্যতাকেও কমিয়ে দিচ্ছে।

অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। একসময় বাণিজ্য ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বুড়িগঙ্গার দূষণ নদীটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কমিয়েছে। একই সঙ্গে নদীনির্ভর জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে।

করণীয় ও ভবিষ্যৎ

ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখন প্রচলিতভাবে বর্জ্য সংগ্রহ ও ভাগাড়ে ফেলার বদলে সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যেতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে:

উৎসে জৈব ও অজৈব বর্জ্য পৃথকীকরণ বাধ্যতামূলক করা।

আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও পরিকল্পিত বর্জ্য থেকে জ্বালানি প্রকল্প সম্প্রসারণ।

বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহনে ডিজিটাল মনিটরিং চালু করে জবাবদিহিতা বাড়ানো।

অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।

শিল্প ও চিকিৎসা বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় নিষ্কাশনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ।

সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা।

গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক জনসচেতনতা কার্যক্রম চালানো।

ঢাকার বর্জ্য সংকট এখন আর শুধু নাগরিক পরিষেবার সমস্যা নয়; এটি পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নগরবাসযোগ্যতার ক্রমবর্ধমান সংকট।

উপসংহার

ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দ্রুত নগরায়নের ফল। তাই এর সমাধানও রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে আগামী দশকে জনসংখ্যা ও বর্জ্য উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তাই শুধু শহর পরিষ্কার রাখার বিষয় নয়; এটি ঢাকার নদী, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ বাসযোগ্যতা রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

শেয়ার

খবরটি কেমন লাগল?

মতামত

ব্যাটারিচালিত রিকশার বহুমাত্রিক সংকট: নীতিনির্ধারকদের সামনে জটিল সমীকরণ

ব্যাটারিচালিত রিকশার দ্রুত বিস্তার বিদ্যুৎ, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর পারস্পরিকভাবে যুক্ত চাপ তৈরি করছে।

৩ মিনিটের পড়া

ধরিত্রী

উত্তপ্ত দক্ষিণ এশিয়া: চরম তাপমাত্রাই হয়ে উঠছে নতুন স্বাভাবিকতা

দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র গরম আরও ঘন ঘন ও আগেভাগে আসছে, বাড়ছে স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অবকাঠামোর ঝুঁকি।

৩ মিনিটের পড়া