জুরাইন–শ্যামপুরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বিক্ষোভ, জনদুর্ভোগ আরও গভীর
দীর্ঘদিনের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দক্ষিণ ঢাকার বাসিন্দারা নিরবচ্ছিন্ন সেবা ও জবাবদিহি দাবি করছেন।

ইউটিলিটি সংকটে রাস্তায় নামলেন বাসিন্দারা
দক্ষিণ ঢাকার জুরাইন ও শ্যামপুর এলাকায় দীর্ঘদিনের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ করেছেন। তাদের অভিযোগ, দিনের পর দিন অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহ এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা দ্রুত সমস্যার সমাধান এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রান্নার গ্যাস অনেক সময় দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে পাওয়া যায় না। আবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে ঘরোয়া কাজ থেকে শুরু করে শিক্ষা, ব্যবসা ও দৈনন্দিন কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত বিল পরিশোধ করলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
এই বিক্ষোভ শুধু দুটি এলাকার সমস্যা নয়; বরং রাজধানীর জনসেবা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
দৈনন্দিন জীবনে বাড়ছে ভোগান্তি
জুরাইন ও শ্যামপুরের অনেক পরিবার জানাচ্ছে, গ্যাস কখন আসবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। ফলে ভোরে বা গভীর রাতে গ্যাসের চাপ ফিরে এলে তখনই রান্না করতে হচ্ছে। অনেক পরিবার একবার গ্যাস পেলে একসঙ্গে কয়েক বেলার খাবার রান্না করে সংরক্ষণ করছে।
অন্যদিকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গরমের মধ্যে শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। ফ্যান, ফ্রিজ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করেছে। কিন্তু এতে মাসিক খরচ বেড়ে যাচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় এমনিতেই বাড়তি চাপ তৈরি করেছে, তার ওপর অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি, নিয়মিত বিলের বিনিময়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
ছোট ব্যবসায় বাড়তি চাপ
এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ছোট ব্যবসাগুলোর ওপর। এলাকার হোটেল, চায়ের দোকান, বেকারি ও খাবারের ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, গ্যাস না থাকায় সময়মতো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ব্যবসার সময় কমাতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিক্রিও কমে যাচ্ছে।
পাইপলাইনের গ্যাসের পরিবর্তে এলপিজি ব্যবহার করতে হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ফ্রিজে খাবার সংরক্ষণ, পানীয় ঠান্ডা রাখা এবং অন্যান্য সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। এতে গ্রাহকসেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের সমস্যা চলতে থাকায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় কমে যাচ্ছে। কর্মচারীদের কাজের সময়ও কমে আসছে, যার প্রভাব তাদের দৈনিক আয়ের ওপর পড়ছে।
স্থায়ী সমাধানের দাবি
সংশ্লিষ্ট ইউটিলিটি কর্তৃপক্ষ দক্ষিণ ঢাকার কিছু এলাকায় সরবরাহ বিঘ্নের বিষয়টি স্বীকার করেছে। তাদের দাবি, প্রযুক্তিগত কাজ এবং বিতরণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরবরাহ স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, এর আগেও একই ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাদের মতে, কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্যাস বা বিদ্যুৎ ফিরে আসা সমস্যার সমাধান নয়; প্রয়োজন নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য সেবা।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত নগরায়ন, চাহিদা বৃদ্ধি, পুরোনো অবকাঠামো এবং বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর ইউটিলিটি ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর তদারকি ছাড়া এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে।
জুরাইন ও শ্যামপুরের বিক্ষোভ তাই কেবল স্থানীয় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি রাজধানীর জনসেবা ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও টেকসই সমাধানের দাবিকে আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
খবরটি কেমন লাগল?
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট: একটি নগরীর নীরব বিপর্যয়
দ্রুত নগরায়ন ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঢাকার সড়ক, ড্রেন ও নদীগুলোতে বাড়ছে বর্জ্যের চাপ।
ঢাকার বায়ু দূষণ: নীরব ঘাতকের কবলে রাজধানী
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্গমন ও ধুলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শীতেই আবার খারাপ হতে পারে ঢাকার বায়ুমান।


